ঢাকা ১১:১২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৮:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

## গণভোট: ‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন বাংলাদেশ

গণভোট কেবল একটি প্রশ্ন বা কাগজে ছাপানো দুটি শব্দের লড়াই নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত জনমত। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, দেশের মানুষ একটি স্পষ্ট বিভাজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে – ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। এই দুটি শব্দের বাইরে আর কোনো অবস্থান নেই, এবং প্রতিটি ‘না’ বা ‘হ্যাঁ’-এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, নৈতিক এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

গণভোটে যারা নীরবতা বেছে নিচ্ছেন, তাদের এই নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়, বরং এটি একটি সুচিন্তিত অবস্থান। এই নীরবতা মূলত ‘না’ পক্ষের প্রতি ইঙ্গিত করে। কারণ, এই গণভোটে ‘না’ মানে কেবল একটি নেতিবাচক উত্তর নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুবিধ অনুষঙ্গ। ‘না’ মানে বর্তমান ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ‘না’ মানে ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে অস্বীকার করা, ‘না’ মানে আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার না করা। এটি July বিপ্লবের বিরোধিতা এবং July সনদের অস্বীকৃতিকেও বোঝায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট যেমন বলেছেন, “স্বৈরতন্ত্র টিকে থাকে জনগণের নীরব সম্মতিতে।” আজকের এই নীরবতা সেই স্বৈরতন্ত্রের প্রতি এক প্রকার পরোক্ষ সম্মতি, যা ‘না’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।

‘না’ মানে সেই সব শহীদের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করা, যারা রাজপথে প্রাণ হারিয়েছেন, যারা চোখ হারিয়েছেন বা পঙ্গু হয়েছেন। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা এবং নৈতিক অবস্থান। এটি ত্যাগ স্বীকারকারী বীরদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস টিলের মতে, “রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে আর ন্যায়বোধ গড়ে ওঠে ত্যাগের স্বীকৃতিতে।” যে রাষ্ট্র তার ত্যাগ স্বীকার করে না, তা নৈতিকভাবে দেউলিয়া। ‘না’ এই দেউলিয়াত্বেরই প্রতীক।

‘না’ মানে পুরনো রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসন, নতুন নামে বা নতুন মুখে হলেও সেই পুরনো কৌশলেই। এটি চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং দলীয় ক্যাডারদের অভয়ারণ্যের ধারাবাহিকতা। ‘না’ মানে বিচারহীনতা এবং ভয়ের সংস্কৃতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্‌জ যেমন উল্লেখ করেছেন, “গণতন্ত্রের মৃত্যু হঠাৎ হয় না। এটি ঘটে ধীরে। নিয়ম ভেঙে। সংস্কার আটকে দিয়ে। নির্বাচন অর্থহীন করে।” এই ‘না’ সেই মৃত্যুর পথকেই নির্দেশ করে।

অন্যদিকে, ‘হ্যাঁ’ মানে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। এটি পুরনো ব্যবস্থার মেরামত নয়, বরং নতুন ব্যবস্থার নির্মাণ। ‘হ্যাঁ’ মানে রাষ্ট্র সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা। এটি দলীয় গণমাধ্যমের অবসান এবং মুক্ত সংবাদ, মুক্ত মত ও মুক্ত চিন্তার প্রতিফলন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল বলেছেন, “গণতন্ত্র টিকে থাকে যখন বিরোধী কণ্ঠ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে।” ‘হ্যাঁ’ সেই সাহস এবং অধিকারের প্রতীক।

‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ, কোনো বিদেশী শক্তির আধিপত্য বা তাঁবেদারি নয়। এটি নিজের পরিচয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, বাংলাদেশি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। এটি তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে প্রকৃত জাতীয়তাবাদের উন্মোচন। ‘হ্যাঁ’ মানে July বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, যেখানে ন্যায়, সমতা এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এটি সেই নৈতিক দায় স্বীকারের সুযোগ, যা বিপ্লবকে পূর্ণতা দেয়।

‘হ্যাঁ’ মানে জালিমের অবসান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ভয়ের রাজনীতির ইতি। এটি তরুণ প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানো, তাদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। আজকের তরুণরা নির্বাক নয়, তারা দেখেছে, ভুগেছে এবং রক্ত দিয়েছে। তাদের কাছে এই গণভোট একটি পরীক্ষা – রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? ‘না’ মানে গোলামির শৃঙ্খল, আর ‘হ্যাঁ’ মানে মুক্তির প্রথম ধাপ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, কোনো সংস্কার উপহার হিসেবে আসে না, তা আদায় করে নিতে হয়। এই গণভোট সেই আদায়ের মুহূর্ত। নীরব থাকা মানে অন্যায়ের পক্ষ নেওয়া, ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়ানো। যারা ‘না’ বলছেন, তারা হয়তো নিজেরা নিরাপদ থাকতে চাইছেন, কিন্তু ইতিহাস নিরাপদদের নয়, বরং যারা অবস্থান নেয় তাদের মনে রাখে।

এই গণভোটে অবস্থান পরিষ্কার – কালো আর সাদা, ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’। এখানে কোনো মাঝামাঝি অবস্থা নেই। ‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে ভবিষ্যৎ। ‘না’ মানে ভয়, ‘হ্যাঁ’ মানে আশা। ‘না’ মানে অবিশ্বাস, ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন বাংলাদেশ। এই পছন্দ এখন জনগণের হাতে এবং ইতিহাসের রায়ও তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

কেন কিছু দল ও গোষ্ঠী ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে এবং ‘না’-এর পক্ষে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাদের হিসাব কী? তারা কী চায়? এই প্রশ্ন আজ তরুণদের এবং দেশের সাধারণ মানুষের। সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটার, যারা ইতিহাস, ভয় এবং রক্ত দেখেছে, তারা জানে ‘না’ মানে কী। ‘না’ মানে ফ্যাসিস্ট শক্তির ভোটব্যাংক, পুরনো ব্যবস্থার পুনর্বাসন এবং ক্ষমতা-লোভীদের একটি চক্র, যারা রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট যেমন বলেছেন, “স্বৈরতন্ত্র সবচেয়ে বেশি শক্তি পায়, যখন পুরোনো অপরাধীরা নতুন স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে।” এই ‘না’ সেই মুখোশ।

অনেকের ধারণা, ‘না’ বললে পুরনো অর্থনৈতিক লুটপাট এবং দখলবাজির রাজনীতি আবার সম্ভব হবে। আরেকটি স্পষ্ট হিসাব হলো ভারতের আধিপত্য। ‘না’ মানে সেই নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে বাংলাদেশ নিজের কথা বলতে ভয় পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাসনার বলেছেন, “দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে আগে ভাঙে যখন তার রাজনৈতিক এলিটরা বাইরের শক্তির সঙ্গে আপস করে।” এই ‘না’ সেই আপসেরই নামান্তর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তরুণরা কি এই অধিকারহীন রাষ্ট্র এবং চিন্তার ওপর পাহারা মেনে নেবে? উত্তর স্পষ্ট – না। কারণ তরুণরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, যা সংস্কার এবং দলীয় ক্যাডারদের অবসানের প্রতীক। তারা কোনো দল নয়, বরং একটি জনসংখ্যাগত শক্তি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন যেমন বলেছেন, “যখন সামাজিক পরিবর্তন রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে দ্রুত হয়, সংঘাত অনিবার্য হয়।” বাংলাদেশে সেই পরিবর্তনের নাম তরুণসমাজ।

তাহলে যারা ‘না’-এর পক্ষে, তারা কেন এই ঝুঁকি নিচ্ছে? এটি একটি কঠিন এবং বিপজ্জনক প্রশ্ন। তারা জানে যে এই ‘না’ জনপ্রিয় নয়, নৈতিক নয়। তবুও ক্ষমতার লোভ এবং পুরনো হিসাব বাঁচানোর তাগিদে তারা এগোচ্ছে। সংস্কার হলে অনেক মুখোশ খুলে যাওয়ার ভয় তাদের। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্‌জ লিখেছেন, “সংস্কার সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায় তাদের, যারা অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।” এই ভয় থেকেই তারা ‘না’ বলছে।

তরুণরা এর উত্তর জানে। তারা July বিপ্লবে দেখেছে, রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের বিপক্ষে দাঁড়ায়, গুলি চলে এবং বিচারহীনতা রক্ষা পায়। এই অভিজ্ঞতার পর ‘না’ বলা সহজ নয়। শুধু তরুণরাই নয়, দেশবাসী সবাই জানে – এই গণভোটে ‘না’ মানে পেছনে ফেরা।

এখানে নিরপেক্ষতা বা মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, গণভোট কেবল মতামত নয়, এটি একটি দায়। রবার্ট ডাল বলেছেন, “গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো – কে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কার স্বার্থে।” এই গণভোট সেই প্রশ্নের উত্তর। যারা ‘না’-এর পক্ষে, তারা হয়তো ভাবছে সময় গেলে সব ভুলে যাবে। কিন্তু তরুণরা এবং ইতিহাস ভুলে না। এই ‘না’ তাদের কাছে কারা রাষ্ট্র চায় এবং কারা ক্ষমতা চায়, তার একটি স্পষ্ট সংকেত।

এ কারণেই ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে, আর ‘না’ পিছিয়ে। নতুন বাংলাদেশ ‘হ্যাঁ’ চায়, এবং সেই ‘হ্যাঁ’ আর থামানো যাবে না। থামাতে গেলে প্রতিরোধ হবে, বিপ্লব হবে, আরেকটি July বিপ্লবের জন্ম হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চোর আটক ঘিরে রণক্ষেত্র রায়পুর: পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে আহত ২০, সড়ক অবরোধে ভোগান্তি

‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১০:৪৮:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## গণভোট: ‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন বাংলাদেশ

গণভোট কেবল একটি প্রশ্ন বা কাগজে ছাপানো দুটি শব্দের লড়াই নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত জনমত। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, দেশের মানুষ একটি স্পষ্ট বিভাজনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে – ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। এই দুটি শব্দের বাইরে আর কোনো অবস্থান নেই, এবং প্রতিটি ‘না’ বা ‘হ্যাঁ’-এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক, নৈতিক এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

গণভোটে যারা নীরবতা বেছে নিচ্ছেন, তাদের এই নীরবতা নিরপেক্ষতা নয়, বরং এটি একটি সুচিন্তিত অবস্থান। এই নীরবতা মূলত ‘না’ পক্ষের প্রতি ইঙ্গিত করে। কারণ, এই গণভোটে ‘না’ মানে কেবল একটি নেতিবাচক উত্তর নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহুবিধ অনুষঙ্গ। ‘না’ মানে বর্তমান ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ‘না’ মানে ফ্যাসিবাদী প্রবণতাকে অস্বীকার করা, ‘না’ মানে আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার না করা। এটি July বিপ্লবের বিরোধিতা এবং July সনদের অস্বীকৃতিকেও বোঝায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট যেমন বলেছেন, “স্বৈরতন্ত্র টিকে থাকে জনগণের নীরব সম্মতিতে।” আজকের এই নীরবতা সেই স্বৈরতন্ত্রের প্রতি এক প্রকার পরোক্ষ সম্মতি, যা ‘না’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।

‘না’ মানে সেই সব শহীদের আত্মত্যাগকে অস্বীকার করা, যারা রাজপথে প্রাণ হারিয়েছেন, যারা চোখ হারিয়েছেন বা পঙ্গু হয়েছেন। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা এবং নৈতিক অবস্থান। এটি ত্যাগ স্বীকারকারী বীরদের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশের সামিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী চার্লস টিলের মতে, “রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে আর ন্যায়বোধ গড়ে ওঠে ত্যাগের স্বীকৃতিতে।” যে রাষ্ট্র তার ত্যাগ স্বীকার করে না, তা নৈতিকভাবে দেউলিয়া। ‘না’ এই দেউলিয়াত্বেরই প্রতীক।

‘না’ মানে পুরনো রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বাসন, নতুন নামে বা নতুন মুখে হলেও সেই পুরনো কৌশলেই। এটি চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং দলীয় ক্যাডারদের অভয়ারণ্যের ধারাবাহিকতা। ‘না’ মানে বিচারহীনতা এবং ভয়ের সংস্কৃতি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্‌জ যেমন উল্লেখ করেছেন, “গণতন্ত্রের মৃত্যু হঠাৎ হয় না। এটি ঘটে ধীরে। নিয়ম ভেঙে। সংস্কার আটকে দিয়ে। নির্বাচন অর্থহীন করে।” এই ‘না’ সেই মৃত্যুর পথকেই নির্দেশ করে।

অন্যদিকে, ‘হ্যাঁ’ মানে একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। এটি পুরনো ব্যবস্থার মেরামত নয়, বরং নতুন ব্যবস্থার নির্মাণ। ‘হ্যাঁ’ মানে রাষ্ট্র সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা। এটি দলীয় গণমাধ্যমের অবসান এবং মুক্ত সংবাদ, মুক্ত মত ও মুক্ত চিন্তার প্রতিফলন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল বলেছেন, “গণতন্ত্র টিকে থাকে যখন বিরোধী কণ্ঠ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে।” ‘হ্যাঁ’ সেই সাহস এবং অধিকারের প্রতীক।

‘হ্যাঁ’ মানে বাংলাদেশকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ, কোনো বিদেশী শক্তির আধিপত্য বা তাঁবেদারি নয়। এটি নিজের পরিচয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, বাংলাদেশি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। এটি তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে প্রকৃত জাতীয়তাবাদের উন্মোচন। ‘হ্যাঁ’ মানে July বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, যেখানে ন্যায়, সমতা এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এটি সেই নৈতিক দায় স্বীকারের সুযোগ, যা বিপ্লবকে পূর্ণতা দেয়।

‘হ্যাঁ’ মানে জালিমের অবসান, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ভয়ের রাজনীতির ইতি। এটি তরুণ প্রজন্মের পাশে দাঁড়ানো, তাদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা। আজকের তরুণরা নির্বাক নয়, তারা দেখেছে, ভুগেছে এবং রক্ত দিয়েছে। তাদের কাছে এই গণভোট একটি পরীক্ষা – রাজনৈতিক দলগুলো কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? ‘না’ মানে গোলামির শৃঙ্খল, আর ‘হ্যাঁ’ মানে মুক্তির প্রথম ধাপ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, কোনো সংস্কার উপহার হিসেবে আসে না, তা আদায় করে নিতে হয়। এই গণভোট সেই আদায়ের মুহূর্ত। নীরব থাকা মানে অন্যায়ের পক্ষ নেওয়া, ইতিহাসের ভুল পাশে দাঁড়ানো। যারা ‘না’ বলছেন, তারা হয়তো নিজেরা নিরাপদ থাকতে চাইছেন, কিন্তু ইতিহাস নিরাপদদের নয়, বরং যারা অবস্থান নেয় তাদের মনে রাখে।

এই গণভোটে অবস্থান পরিষ্কার – কালো আর সাদা, ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’। এখানে কোনো মাঝামাঝি অবস্থা নেই। ‘না’ মানে অতীত, ‘হ্যাঁ’ মানে ভবিষ্যৎ। ‘না’ মানে ভয়, ‘হ্যাঁ’ মানে আশা। ‘না’ মানে অবিশ্বাস, ‘হ্যাঁ’ মানে নতুন বাংলাদেশ। এই পছন্দ এখন জনগণের হাতে এবং ইতিহাসের রায়ও তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

কেন কিছু দল ও গোষ্ঠী ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে এবং ‘না’-এর পক্ষে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাদের হিসাব কী? তারা কী চায়? এই প্রশ্ন আজ তরুণদের এবং দেশের সাধারণ মানুষের। সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটার, যারা ইতিহাস, ভয় এবং রক্ত দেখেছে, তারা জানে ‘না’ মানে কী। ‘না’ মানে ফ্যাসিস্ট শক্তির ভোটব্যাংক, পুরনো ব্যবস্থার পুনর্বাসন এবং ক্ষমতা-লোভীদের একটি চক্র, যারা রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট যেমন বলেছেন, “স্বৈরতন্ত্র সবচেয়ে বেশি শক্তি পায়, যখন পুরোনো অপরাধীরা নতুন স্বাভাবিকতার মুখোশ পরে।” এই ‘না’ সেই মুখোশ।

অনেকের ধারণা, ‘না’ বললে পুরনো অর্থনৈতিক লুটপাট এবং দখলবাজির রাজনীতি আবার সম্ভব হবে। আরেকটি স্পষ্ট হিসাব হলো ভারতের আধিপত্য। ‘না’ মানে সেই নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে বাংলাদেশ নিজের কথা বলতে ভয় পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাসনার বলেছেন, “দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সবচেয়ে আগে ভাঙে যখন তার রাজনৈতিক এলিটরা বাইরের শক্তির সঙ্গে আপস করে।” এই ‘না’ সেই আপসেরই নামান্তর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তরুণরা কি এই অধিকারহীন রাষ্ট্র এবং চিন্তার ওপর পাহারা মেনে নেবে? উত্তর স্পষ্ট – না। কারণ তরুণরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে, যা সংস্কার এবং দলীয় ক্যাডারদের অবসানের প্রতীক। তারা কোনো দল নয়, বরং একটি জনসংখ্যাগত শক্তি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন যেমন বলেছেন, “যখন সামাজিক পরিবর্তন রাজনৈতিক কাঠামোর চেয়ে দ্রুত হয়, সংঘাত অনিবার্য হয়।” বাংলাদেশে সেই পরিবর্তনের নাম তরুণসমাজ।

তাহলে যারা ‘না’-এর পক্ষে, তারা কেন এই ঝুঁকি নিচ্ছে? এটি একটি কঠিন এবং বিপজ্জনক প্রশ্ন। তারা জানে যে এই ‘না’ জনপ্রিয় নয়, নৈতিক নয়। তবুও ক্ষমতার লোভ এবং পুরনো হিসাব বাঁচানোর তাগিদে তারা এগোচ্ছে। সংস্কার হলে অনেক মুখোশ খুলে যাওয়ার ভয় তাদের। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জুয়ান লিন্‌জ লিখেছেন, “সংস্কার সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায় তাদের, যারা অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।” এই ভয় থেকেই তারা ‘না’ বলছে।

তরুণরা এর উত্তর জানে। তারা July বিপ্লবে দেখেছে, রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের বিপক্ষে দাঁড়ায়, গুলি চলে এবং বিচারহীনতা রক্ষা পায়। এই অভিজ্ঞতার পর ‘না’ বলা সহজ নয়। শুধু তরুণরাই নয়, দেশবাসী সবাই জানে – এই গণভোটে ‘না’ মানে পেছনে ফেরা।

এখানে নিরপেক্ষতা বা মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে, গণভোট কেবল মতামত নয়, এটি একটি দায়। রবার্ট ডাল বলেছেন, “গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো – কে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কার স্বার্থে।” এই গণভোট সেই প্রশ্নের উত্তর। যারা ‘না’-এর পক্ষে, তারা হয়তো ভাবছে সময় গেলে সব ভুলে যাবে। কিন্তু তরুণরা এবং ইতিহাস ভুলে না। এই ‘না’ তাদের কাছে কারা রাষ্ট্র চায় এবং কারা ক্ষমতা চায়, তার একটি স্পষ্ট সংকেত।

এ কারণেই ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে, আর ‘না’ পিছিয়ে। নতুন বাংলাদেশ ‘হ্যাঁ’ চায়, এবং সেই ‘হ্যাঁ’ আর থামানো যাবে না। থামাতে গেলে প্রতিরোধ হবে, বিপ্লব হবে, আরেকটি July বিপ্লবের জন্ম হবে।