‘দেশের চাবি, আপনার হাতে’—এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে ‘ভোটের গাড়ি’ কর্মসূচি দেশজুড়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্থাপিত ‘জনমত বাক্স’-এ সাধারণ মানুষ তাদের মনের কথা সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে ব্যক্ত করেছেন। গণভোট–২০২৬ এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত এই প্রচারণায় নাগরিকরা টুকরো কাগজে লেখা তাদের মতামত জমা দিয়েছেন, যা থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট ৪০ হাজার ২০৬ জন সাধারণ নাগরিক ‘জনমত বাক্স’-এর মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের মূল্যবান মন্তব্য ও মতামত পৌঁছে দিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্ট থেকে জানা যায়, এই মতামতগুলোতে বানানের ভুল বা বাক্য গঠনের অসম্পূর্ণতা থাকলেও আবেগের গভীরতা ছিল স্পষ্ট। নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত দুঃখ, সরকারি সেবার ক্ষেত্রে হয়রানি থেকে মুক্তি, রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার, এমনকি জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারও চেয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা, শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা এবং দুর্নীতি ও আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্নও উঠে এসেছে তাদের লেখায়। পাশাপাশি, কিছু মন্তব্য ব্যক্তি আক্রমণাত্মক বা সরকারের সমালোচনামূলক হলেও, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই ৪০ হাজার ২০৬টি মতামতকেই গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছেন।
‘ভোটের গাড়ি’ কর্মসূচিটি সারা দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সদরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ২,১৬৯টি স্পটে প্রচারণা চালিয়েছে। এই প্রচারণার অংশ হিসেবে সংগৃহীত মতামতগুলোর মধ্যে ঢাকা বিভাগ থেকে এসেছে ১০,২১৬টি, চট্টগ্রাম থেকে ৬,০০৬টি, সিলেট থেকে ১,৬৫১টি, বরিশাল থেকে ২,১২৪টি, খুলনা থেকে ৪,৬৭৮টি, রংপুর থেকে ৩,৬০৫টি, রাজশাহী থেকে ৫,৭৩৮টি এবং ময়মনসিংহ থেকে ১,৭৯৯টি মন্তব্য।
বিভিন্ন স্থান থেকে আসা কিছু উল্লেখযোগ্য মন্তব্য হলো:
গাজীপুর (১০ বছর বয়সী রাফা): “আমার পরামর্শ হলো আমি এ দেশের মাটি ও বাতাসের মাঝে নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে দেখতে চাই। এরকম একটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে নীতি-নির্ধারক তৈরি করার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করুন।”
কুমিল্লা (দেওয়ান সালাহউদ্দিন): “সুষ্ঠু ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। মানুষ চায় সুষ্ঠু ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে পারে। কেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করা যাবে না। আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো। প্রধান উপদেষ্টা ভালো ভোট আয়োজন করবেন।”
চট্টগ্রাম (গোলাম রাব্বানি): “আমি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি। আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য কোম্পানির মালিককে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।”
ঠাকুরগাঁও (একজন দিনমজুর): “গরিব মানুষ দিন মজুর করে খায়। গরুর মাংস আমরা কিনে খেতে পারি না। বাজার নিয়ন্ত্রণ চাই, সিন্ডিকেট চলছে বাজারে। গরিব মানুষ কিনে খেতে পারছে না।”
বরিশাল (সাদিক): “যে দেশে শিক্ষকদের মান উন্নয়ন নিয়ে কেউ ভাবে না, সে দেশে সুন্দর আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব না।”
পিরোজপুর (একজন নাগরিক): “বাংলাদেশের সকল মানুষের অধিকার দিতে হবে। সব ধর্মের মানুষের অধিকার দিতে হবে। সবাইকে বাকস্বাধীনতা অধিকার দিতে হবে। স্বাধীন বাংলার সবার অধিকার থাকবে। পক্ষপাতিত্ব যেন না হয়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান একসঙ্গে বাঁচতে চাই। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা চাই।”
দিনাজপুর (লিজা, বিপাশা, সুমি, লিনা, বৃষ্টি): “জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মনে রেখে দেশের সুন্দর ও সুষ্ঠু সংস্কার চাই। নারী ও শিশুদের অধিকার, ধর্ষণের ১০ দিনের মধ্যে রায় কার্যকর হোক। রাজনীতি যে দলই আসুক না কেন, দেশের সংস্কারে যেন সকলেই নিয়োজিত থাকে।”
নাগরিকদের এই সাবলীল, আবেগাপ্লুত এবং অকপট মন্তব্যগুলো পড়ে প্রধান উপদেষ্টা উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। তিনি বলেন, জনগণের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা এক অমূল্য সম্পদ। তাই কোনো ধরনের সম্পাদনা বা পরিবর্তন ছাড়াই সকল প্রশংসা, মন্তব্য, পরামর্শ এবং সমালোচনা-নিন্দাও সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রিপোর্টারের নাম 






















