ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি। গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এলেও এখন পর্যন্ত ঝুলে আছে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশের বিষয়টি। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন যে, সব উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁদের সম্পদের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন। তবে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখেনি দেশবাসী।
প্রতিশ্রুতির দেড় বছর ও আইনি কাঠামো
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ২৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের অঙ্গীকার করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১ অক্টোবর একটি নীতিমালা জারি করা হয়। নীতিমালায় বলা হয়েছিল, উপদেষ্টারা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাঁদের সম্পদ বিবরণী জমা দেবেন। এই বিবরণী প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বিবেচনায় ‘উপযুক্ত পদ্ধতিতে’ প্রকাশ করবেন।
উপদেষ্টারা বলছেন ‘হিসাব জমা দিয়েছি’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় সব উপদেষ্টাই তাঁদের সম্পদের হিসাব যথাসময়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:
- অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: তিনি জানিয়েছেন, বেশ আগেই হিসাব জমা দিয়েছেন।
- আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল: গত বছর এবং এ বছরও বিবরণী জমা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন।
- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান: তিনি ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজেও তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার তথ্য প্রকাশ করেছেন।
- এছাড়া সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, তৌহিদ হোসেন এবং নূরজাহান বেগমসহ অন্যান্য উপদেষ্টারাও হিসাব দাখিল করেছেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
কেন প্রকাশ করা হয়নি?
সব প্রস্তুতি থাকলেও কেন জনসমক্ষে এই হিসাব আনা হলো না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “আমরা আশা করছি এটা অচিরেই দেখতে পাবেন। আমাদের সময় যখন শেষ হয়ে আসবে, তখন দেখতে পাবেন।” তবে নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন হতে বড়জোর এক সপ্তাহ সময় বাকি থাকতে এই বিলম্বকে ‘গোপনীয়তা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
টিআইবি-র প্রতিক্রিয়া: নেতিবাচক দৃষ্টান্ত
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই বিলম্বকে চরম হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “এটি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রদত্ত অঙ্গীকারের বরখেলাপ। রাষ্ট্র সংস্কার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার যে আশা সরকার দেখিয়েছিল, এটি তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই বিলম্ব একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
অন্তর্বর্তী সরকার বিদায়ের আগে শেষ মুহূর্তে এই হিসাব প্রকাশ করবে কি না, নাকি এটি কেবল ফাইলবন্দি অবস্থাতেই পরবর্তী সরকারের হাতে চলে যাবে—তা নিয়ে এখন সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠছে।
রিপোর্টারের নাম 























