আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চরম এক অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে ৭৯টি আসনে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় বেশ কিছু আসনে জয় হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বিদ্রোহ শুধু দলের নিজস্ব ভোটব্যাংককেই বিভক্ত করছে না, বরং জোট শরিকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
দলীয় সূত্র মতে, এই ৯২ জন বিদ্রোহীর মধ্যে প্রায় ৩০ জনই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয়, যা দলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রকাশ্যে দাবি করছে যে, এই বিদ্রোহ নির্বাচনি ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলবে না, তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টিকে নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, “আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি, অনেকেই স্বেচ্ছায় সরে যাচ্ছেন। এর ফলে নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না।” তবে যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে জানিয়েছেন, “যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা শোনেননি। তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনগণ ধানের শীষ দেখেই ভোট দেবে, বিদ্রোহীরা জনসমর্থন হারাবে।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীরা অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তাদের কেউ কেউ সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় এলাকায় তাদের নিজস্ব জনভিত্তি রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও এই প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কমিটিগুলোও বিদ্রোহী ও মূল প্রার্থীর পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।
এই বিদ্রোহ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বিএনপি। গত ২১ জানুয়ারি এক দফায় ৫৯ জন নেতাসহ এর আগে ও পরে আরও কয়েক ধাপে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি উপজেলা ও থানা কমিটি বিলুপ্ত করার মতো সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ২০ আসনের তিনটিতে শক্তিশালী বিদ্রোহী
রাজধানী ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে অন্তত তিনটি আসনে বিএনপির শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের সবার প্রতীক ফুটবল।
ঢাকা-৭ আসনে (লালবাগ-চকবাজার-বংশাল-কামরাঙ্গীরচর ও কোতোয়ালি আংশিক) যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আলোচনায়। তার বিরুদ্ধে ৩৬৫টি মামলা রয়েছে এবং আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
ঢাকা-১৪ আসনে দারুস সালাম থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) বিদ্রোহী প্রার্থী। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য এসএ খালেকের ছেলে এবং এ আসনে তার নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। এই আসনে বিএনপির মূল প্রার্থী সানজিদা ইসলাম (তুলি) এবং জোট শরিক জামায়াতের মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানও রয়েছেন। ফলে এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
এছাড়া, ঢাকা-১২ আসনে জোট শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু এই আসনে বিএনপির শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব। তার পক্ষে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ কাজ করছে, যা জোট প্রার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দলের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে বিদ্রোহীরা জনপ্রিয়, সেখানে দলের মূল প্রার্থীর জয় কঠিন হয়ে পড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দলের সামগ্রিক ফলাফলের ওপর।
রিপোর্টারের নাম 























