আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ শত শত গুম ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত জিয়াউলের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিতে গিয়ে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তিনি বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীতে বিভেদ সৃষ্টি করা হয় এবং বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বিশ্বাস কাজ করেছে যে, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনীই তার জন্য নিরাপদ।
ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ ঘটনার পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়। এ সময়ে সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে ব্যাপক বিভাজন দেখা দেয়। পেশাদার ও যোগ্য অফিসারদের একপাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের পদোন্নতি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। বিভিন্ন জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করে বাহিনীটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সাবেক সেনাপ্রধান আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের শাসনামলের দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা শুরু করেন। এই লক্ষ্যে তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বহু রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।
এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দাবি, তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট হন। তারেক সিদ্দীকি দ্রুতই প্রধানমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে নিজেকে একজন ‘সুপার চীফ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব, এনটিএমসি, আনসার এবং বিজিবি-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর ফলশ্রুতিতে চারটি বিশেষ চক্রের উদ্ভব ঘটে বলেও সাবেক সেনাপ্রধান উল্লেখ করেন।
ভূঁইয়া চক্রগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলেন, প্রথম চক্রটি ছিল ‘অপরাধ চক্র’, যা ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাব ও এনটিএমসিকে ব্যবহার করে পরিচালিত হতো। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা ঘটানো হতো। দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ‘ডিপ স্টেট’, যা এমএসপিএম, ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এই চক্র তিন বাহিনী সম্পর্কিত সমস্ত নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো, যা অনেক ক্ষেত্রেই বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল।
তৃতীয় চক্রটি ছিল ‘কেনা-কাটা চক্র’। এতে পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি এবং তিন বাহিনীর প্রধানরা যুক্ত ছিলেন। এই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সামরিক কেনা-কাটায় প্রভাব বিস্তার করা হতো। চতুর্থ চক্রটি ছিল ‘সামরিক প্রকৌশলী চক্র’। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি যেহেতু ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তাই তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের নিয়ে একটি আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তার প্রভাব বিস্তার শুরু করা হয়, যা অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে বলেও সাবেক সেনাপ্রধান তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।
রিপোর্টারের নাম 

























