ঢাকা ০৯:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

নীল দিগন্তের শেষ প্রান্তে প্রবালের হাতছানি: ছেঁড়া দ্বীপের নির্জন সৌন্দর্য

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৪৫:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

বঙ্গোপসাগরের হৃৎপিণ্ড থেকে যেন ছিঁড়ে আসা এক টুকরো নীলিমার কাব্য – এমনই এক নাম ছেঁড়া দ্বীপ। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের এই প্রবাল দ্বীপ তার অসীম নীল জলরাশি, প্রকৃতির আদিম নির্জনতা আর প্রাচীন প্রবালের মিতালিতে পর্যটকদের কাছে এক অনবদ্য আকর্ষণ। মাথার ওপর সুউচ্চ আকাশ আর চারদিকে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির মাঝে নির্জন এ দ্বীপ যেন পাখিদের কলকাকলিতে মুখর এক রহস্যময় ভূখণ্ড।

ভোরের আবছা আলো তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফজরের আজানের পরপরই আমরা সেন্টমার্টিনের রিসোর্ট থেকে ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হলাম। সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে সেন্টমার্টিনের গ্রামীণ পথ পেরিয়ে যখন সমুদ্র সৈকতে নামলাম, তখনো সূর্য ওঠেনি। দিগন্তে ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সমুদ্র তখন ভাটার টানে অনেকটা দূরে সরে গেছে, উন্মুক্ত বালুকাময় সৈকতে বাইশ জনের একদল সাইকেল আরোহী এগিয়ে চলছি গন্তব্যের দিকে। একপাশে উত্তাল সাগরের হাতছানি, অন্যপাশে দ্বীপ রক্ষাকারী কেয়া গাছের সারি। প্রায় তিরিশ মিনিট সাইকেল চালিয়ে আমরা সেন্টমার্টিনের শেষ প্রান্তে পৌঁছাই।

সেখানে সাইকেল রেখে শুরু হলো পায়ে হাঁটা পথচলা। ভাটার কারণে সাগরের বুক থেকে জেগে উঠেছে হাজারো প্রবাল পাথর। ভোরের মৃদু বাতাস আর সুনসান নীরবতা এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। উত্তাল সাগরও যেন এই নির্জনতা উপভোগ করছে। প্রবালের ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা এগিয়ে চলি ছেঁড়া দ্বীপের শেষ প্রান্তের দিকে। পথিমধ্যে অনেকেই ফজরের নামাজ আদায় করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই পূর্ব দিগন্তে উঁকি দেয় রক্তিম সূর্য। সেই অপরূপ দৃশ্যে অনেকেই নিজেকে ফ্রেমবন্দী করেন, চলে গ্রুপ ছবি তোলার পালা। আমাদের ট্যুর গাইড দ্বীপ টিকিয়ে রাখার জন্য কেয়া গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে জানান এবং বলেন, ভাটার সময় ছেঁড়া দ্বীপের ছোট-বড় তিনটি অংশই পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা যায়। শেষ দ্বীপে পৌঁছানোর পর এক নাম না জানা আহত পাখির দেখা মেলে, যা হয়তো কোনো আঘাত পেয়ে অথবা পথভ্রান্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে এই নির্জন দ্বীপে। প্রকৃতির এই আদিম সৌন্দর্যের মাঝে কিছুক্ষণ পর সূর্যের প্রখরতা বাড়তে শুরু করে এবং সাগরে জোয়ারের আনাগোনাও স্পষ্ট হতে থাকে।

ছেঁড়া দ্বীপে দাঁড়ালে আকাশের বিশালতা আর সাগরের উদারতা ঠিক কতটা, তা ভালোই উপলব্ধি করা যায়। দিগন্তরেখায় আকাশ আর জল যেন একে অপরের ঠোঁট ছুঁয়ে আছে। মাথার ওপর মেঘেদের অলস ওড়াউড়ি আর পায়ের নিচে চঞ্চল ঢেউয়ের গর্জন – এ দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়, আবার একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষও মনে হয়। এ যেন প্রকৃতির এক অপরূপ চিত্রকল্প। এ দ্বীপের সৈকত সাধারণ বালুকাময় নয়, বরং আদিম প্রবালের নকশা দিয়ে সাজানো। ভাটার সময় যখন সমুদ্রের জল সরে যায়, তখন হাজার বছরের পুরোনো সেই প্রবালগুলো জেগে ওঠে। যখন নীল জলরাশি প্রবল গর্জনে কূলে এসে আছড়ে পড়ে, তখন সেই শুভ্র ফেনার রাশি যেন প্রবাল পাথরগুলোকে পরম মমতায় স্নান করিয়ে দেয়।

এই স্মরণীয় ভ্রমণটি ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) ২০২৬ সালের গ্র্যান্ড ট্যুর। সমিতির সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের মিলনমেলায় মুখরিত এই সফরে ছেঁড়া দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। হাদি হত্যার বিচার, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার রোধে সচেতনতার বার্তা সম্বলিত পোস্টার হাতে নিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদে অংশ নেন সদস্যরা। ২৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে তিন দিনের এই আনন্দময় সফর শেষ হয় ১ ফেব্রুয়ারি, রোববার মধ্যরাতে। হাসি-আড্ডা আর অভিজ্ঞতার ডালি ভরে আমরা ফিরেছি আপন নীড়ে।

জোয়ারের পানি বাড়তে থাকায় দ্রুত দ্বীপ ত্যাগের নির্দেশ আসে। যে পথ দিয়ে হেঁটে এসেছিলাম, সেই পথেই এবার হাঁটুপানি। দ্রুত সাইকেলের কাছে ফিরে রিসোর্টের পথে রওনা দেই। ফেরার পথে সেন্টমার্টিনের সুমিষ্ট ডাব ও তরমুজের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। প্রকৃতির এমন অপরূপ লীলাভূমি ছেঁড়া দ্বীপ কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি আত্মিক প্রশান্তির এক তীর্থস্থান। যেখানে গেলে মানুষের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায় সাগরের বিশালতায়, আর হৃদয়ে জেগে ওঠে প্রকৃতির প্রতি এক গভীর প্রেম। নীল জলরাশি আর ধূসর পাথরের এই মিতালি বারবার মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীটা যতটা সুন্দর, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। গন্তব্যে ফিরলেও ছেঁড়া দ্বীপের সেই নির্জন সৌন্দর্য আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জন যেন এখনো কানে বাজে, মনে বারবার উঁকি দেয়—‘আহ্! যদি এখানে থেকে যেতে পারতাম!’

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাকাত নিয়ে বিএনপি নেত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য: হেফাজতে ইসলামের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়

নীল দিগন্তের শেষ প্রান্তে প্রবালের হাতছানি: ছেঁড়া দ্বীপের নির্জন সৌন্দর্য

আপডেট সময় : ০৭:৪৫:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের হৃৎপিণ্ড থেকে যেন ছিঁড়ে আসা এক টুকরো নীলিমার কাব্য – এমনই এক নাম ছেঁড়া দ্বীপ। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের এই প্রবাল দ্বীপ তার অসীম নীল জলরাশি, প্রকৃতির আদিম নির্জনতা আর প্রাচীন প্রবালের মিতালিতে পর্যটকদের কাছে এক অনবদ্য আকর্ষণ। মাথার ওপর সুউচ্চ আকাশ আর চারদিকে বিস্তীর্ণ নীল জলরাশির মাঝে নির্জন এ দ্বীপ যেন পাখিদের কলকাকলিতে মুখর এক রহস্যময় ভূখণ্ড।

ভোরের আবছা আলো তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফজরের আজানের পরপরই আমরা সেন্টমার্টিনের রিসোর্ট থেকে ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হলাম। সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে সেন্টমার্টিনের গ্রামীণ পথ পেরিয়ে যখন সমুদ্র সৈকতে নামলাম, তখনো সূর্য ওঠেনি। দিগন্তে ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়ছে। সমুদ্র তখন ভাটার টানে অনেকটা দূরে সরে গেছে, উন্মুক্ত বালুকাময় সৈকতে বাইশ জনের একদল সাইকেল আরোহী এগিয়ে চলছি গন্তব্যের দিকে। একপাশে উত্তাল সাগরের হাতছানি, অন্যপাশে দ্বীপ রক্ষাকারী কেয়া গাছের সারি। প্রায় তিরিশ মিনিট সাইকেল চালিয়ে আমরা সেন্টমার্টিনের শেষ প্রান্তে পৌঁছাই।

সেখানে সাইকেল রেখে শুরু হলো পায়ে হাঁটা পথচলা। ভাটার কারণে সাগরের বুক থেকে জেগে উঠেছে হাজারো প্রবাল পাথর। ভোরের মৃদু বাতাস আর সুনসান নীরবতা এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। উত্তাল সাগরও যেন এই নির্জনতা উপভোগ করছে। প্রবালের ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা এগিয়ে চলি ছেঁড়া দ্বীপের শেষ প্রান্তের দিকে। পথিমধ্যে অনেকেই ফজরের নামাজ আদায় করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই পূর্ব দিগন্তে উঁকি দেয় রক্তিম সূর্য। সেই অপরূপ দৃশ্যে অনেকেই নিজেকে ফ্রেমবন্দী করেন, চলে গ্রুপ ছবি তোলার পালা। আমাদের ট্যুর গাইড দ্বীপ টিকিয়ে রাখার জন্য কেয়া গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে জানান এবং বলেন, ভাটার সময় ছেঁড়া দ্বীপের ছোট-বড় তিনটি অংশই পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা যায়। শেষ দ্বীপে পৌঁছানোর পর এক নাম না জানা আহত পাখির দেখা মেলে, যা হয়তো কোনো আঘাত পেয়ে অথবা পথভ্রান্ত হয়ে আশ্রয় নিয়েছে এই নির্জন দ্বীপে। প্রকৃতির এই আদিম সৌন্দর্যের মাঝে কিছুক্ষণ পর সূর্যের প্রখরতা বাড়তে শুরু করে এবং সাগরে জোয়ারের আনাগোনাও স্পষ্ট হতে থাকে।

ছেঁড়া দ্বীপে দাঁড়ালে আকাশের বিশালতা আর সাগরের উদারতা ঠিক কতটা, তা ভালোই উপলব্ধি করা যায়। দিগন্তরেখায় আকাশ আর জল যেন একে অপরের ঠোঁট ছুঁয়ে আছে। মাথার ওপর মেঘেদের অলস ওড়াউড়ি আর পায়ের নিচে চঞ্চল ঢেউয়ের গর্জন – এ দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হয়, আবার একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষও মনে হয়। এ যেন প্রকৃতির এক অপরূপ চিত্রকল্প। এ দ্বীপের সৈকত সাধারণ বালুকাময় নয়, বরং আদিম প্রবালের নকশা দিয়ে সাজানো। ভাটার সময় যখন সমুদ্রের জল সরে যায়, তখন হাজার বছরের পুরোনো সেই প্রবালগুলো জেগে ওঠে। যখন নীল জলরাশি প্রবল গর্জনে কূলে এসে আছড়ে পড়ে, তখন সেই শুভ্র ফেনার রাশি যেন প্রবাল পাথরগুলোকে পরম মমতায় স্নান করিয়ে দেয়।

এই স্মরণীয় ভ্রমণটি ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (চবিসাস) ২০২৬ সালের গ্র্যান্ড ট্যুর। সমিতির সাবেক ও বর্তমান সদস্যদের মিলনমেলায় মুখরিত এই সফরে ছেঁড়া দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। হাদি হত্যার বিচার, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং সেন্টমার্টিনে প্লাস্টিকের অবাধ ব্যবহার রোধে সচেতনতার বার্তা সম্বলিত পোস্টার হাতে নিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদে অংশ নেন সদস্যরা। ২৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে তিন দিনের এই আনন্দময় সফর শেষ হয় ১ ফেব্রুয়ারি, রোববার মধ্যরাতে। হাসি-আড্ডা আর অভিজ্ঞতার ডালি ভরে আমরা ফিরেছি আপন নীড়ে।

জোয়ারের পানি বাড়তে থাকায় দ্রুত দ্বীপ ত্যাগের নির্দেশ আসে। যে পথ দিয়ে হেঁটে এসেছিলাম, সেই পথেই এবার হাঁটুপানি। দ্রুত সাইকেলের কাছে ফিরে রিসোর্টের পথে রওনা দেই। ফেরার পথে সেন্টমার্টিনের সুমিষ্ট ডাব ও তরমুজের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। প্রকৃতির এমন অপরূপ লীলাভূমি ছেঁড়া দ্বীপ কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি আত্মিক প্রশান্তির এক তীর্থস্থান। যেখানে গেলে মানুষের অহংকার চূর্ণ হয়ে যায় সাগরের বিশালতায়, আর হৃদয়ে জেগে ওঠে প্রকৃতির প্রতি এক গভীর প্রেম। নীল জলরাশি আর ধূসর পাথরের এই মিতালি বারবার মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীটা যতটা সুন্দর, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। গন্তব্যে ফিরলেও ছেঁড়া দ্বীপের সেই নির্জন সৌন্দর্য আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জন যেন এখনো কানে বাজে, মনে বারবার উঁকি দেয়—‘আহ্! যদি এখানে থেকে যেতে পারতাম!’