পবিত্র মাহে রমজান কেবল পানাহার বর্জনের মাস নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও মননশীলতা অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। সাধারণত রোজার আগে আমরা শারীরিক প্রস্তুতি বা কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি, কিন্তু এই ইবাদতের মূল ভিত্তি যেখানে নিহিত—সেই মনকে প্রস্তুত করার বিষয়টি অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়। অথচ একটি সুন্দর ও সার্থক রমজান কাটানোর জন্য হৃদয়ের প্রস্তুতিই সবচেয়ে জরুরি।
রমজানের প্রস্তুতির প্রধান সোপান হলো দৃঢ় সংকল্প বা নিয়ত। ঘরে কোনো বিশেষ অতিথির আগমন ঘটলে আমরা যেমন আনন্দিত ও উদগ্রীব থাকি, রমজানকেও ঠিক তেমন এক পরমাত্মীয়ের মতো বরণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করা প্রয়োজন যেন তিনি আমাদের অন্তরকে যাবতীয় কলুষতা থেকে মুক্ত করেন এবং এই মাসে ইবাদতের মাধ্যমে হৃদয়ের অপ্রয়োজনীয় আসক্তি ও পাপের বোঝা হালকা করার তৌফিক দান করেন।
ইসলামী গবেষকদের মতে, ‘রমজান’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো এমন এক উত্তাপ যা সবকিছু পুড়িয়ে ফেলে। অর্থাৎ, এটি মুমিনের জীবনের যাবতীয় পঙ্কিলতা পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার মাস। তাই কেবল প্রথাগতভাবে রোজা রাখা নয়, বরং নিজের আচরণ, চিন্তা ও প্রাত্যহিক অভ্যাসে গুণগত পরিবর্তন আনার শপথ নিতে হবে এখনই। আত্মিক এই পরিবর্তনের সংকল্পই রমজানকে ফলপ্রসূ করে তোলে।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা ও ডিজিটাল কোলাহল থেকে মনকে সরিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে নেওয়ার জন্য নির্জনতার প্রয়োজন। সারাক্ষণ স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকলে হৃদয়ের গভীরতা অনুভব করা সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় নিরিবিলিতে কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলার। কোনো প্রকার বাহ্যিক বিভ্রান্তি ছাড়া চুপচাপ বসে নিজের ভুলত্রুটি নিয়ে ভাবা, তওবা করা এবং স্রষ্টার সঙ্গে আত্মিক সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা মানসিক প্রস্তুতির অন্যতম সেরা মাধ্যম। প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট নীরবতা পালনের অভ্যাস রমজানে ইবাদতে একাগ্রতা ও মনোযোগ বাড়াতে জাদুর মতো কাজ করে।
রমজান পরবর্তী জীবনের পরিকল্পনাও এই প্রস্তুতির একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত। অনেকেই রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার পুরনো অনভ্যাসে ফিরে যান। এই প্রবণতা রোধে এখন থেকেই একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা সাজানো দরকার। কোরআন তিলাওয়াত, নিয়মিত নামাজ ও অন্যান্য নফল ইবাদতগুলো যেন সারা বছর ধরে রাখা যায়, সেই লক্ষ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরি করা প্রয়োজন।
পরিশেষে, রমজান যেন আমাদের জীবনে কেবল একটি মাস হিসেবে না আসে, বরং এটি যেন হয় জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক অনন্য পাথেয়। হৃদয়ের দুয়ার খুলে এই পবিত্র মাসকে স্বাগত জানালে তবেই এর প্রকৃত সুফল এবং আত্মিক জাগরণ সম্ভব।
রিপোর্টারের নাম 























