ঢাকা ১১:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

মনন ও সংস্কৃতির পুনর্গঠন: শাহ্ আবদুল হালিমের ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ এক অনন্য সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:৫৩:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

আধুনিক মুসলিম সমাজে সংস্কৃতির স্বরূপ এবং এর বিবর্তন নিয়ে এক গভীর ও তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ উপস্থাপন করেছেন চিন্তাবিদ শাহ্ আবদুল হালিম। তাঁর রচিত ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ গ্রন্থটি কেবল প্রথাগত কোনো আলোচনা নয়, বরং এটি সমকালীন সমাজ, ধর্ম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর এক সমন্বিত পর্যালোচনামূলক দলিল। লেখক এখানে সংস্কৃতিকে কেবল শিল্প বা বিনোদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা, ভাষা ও জীবনদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

গ্রন্থটির শুরুতেই লেখক সংস্কৃতির সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর মতে, একটি সমাজের মানসিক ও নৈতিক উন্নতির মাপকাঠি হলো তার সংস্কৃতির গভীরতা। ইসলাম ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মেলবন্ধন নিয়ে আলোচনায় তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলাম কোনো সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক মডেল চাপিয়ে দেয় না। বরং নৈতিক সীমানার ভেতরে থেকে বিভিন্ন স্থানীয় আচার ও প্রথাকে গ্রহণ করার মাধ্যমে এক ধরনের উদার ও মানবিক বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করে। মুসলিম ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এই সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি সমকালীন সংকটের মূলে আলোকপাত করেছেন।

শাহ্ আবদুল হালিম বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক সংকটকে আত্মপরিচয়হীনতা এবং ভোগবাদের ফলাফল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, আধুনিক সমাজের নৈতিক বিভ্রান্তি ও অন্ধ অনুকরণপ্রবণতার প্রধান কারণ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা। এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার’-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। লেখকের মতে, সংস্কার মানে কেবল বাহ্যিক আচরণ পরিবর্তন নয়, বরং চিন্তাধারা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতার আমূল পরিবর্তন।

বইটিতে সংস্কৃতির রূপান্তর ও বিন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। লেখক স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, সংস্কৃতি কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বাজার অর্থনীতির প্রভাবে মানুষের রুচি ও অভ্যাসের যে পরিবর্তন ঘটছে, তার একটি সমাজতাত্ত্বিক চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যে সবসময় মানবিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না, সেই রূঢ় সত্যটিও তিনি তুলে ধরেছেন। এছাড়া সমাজের স্তরভেদে এলিট ও প্রান্তিক সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ পাঠকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান দশা নিয়ে লেখকের সমালোচনা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। শিক্ষা যখন কেবল সনদ অর্জন ও জীবিকা নির্বাহের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেয়। ভাষার সঠিক ব্যবহার এবং শব্দের পরিভাষাগত নির্ভুলতা যে চিন্তার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কতটা জরুরি, তা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি কেবল ক্ষমতার লড়াইকে বড় করে দেখেননি, বরং সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রাজনীতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন।

শিল্প, সংগীত এবং তথ্যবিপ্লব নিয়ে শাহ্ আবদুল হালিমের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে তিনি কোনো বহিরাগত ষড়যন্ত্রের চেয়ে নিজেদের চিন্তার দৈন্য ও আত্মসমালোচনার অভাবকে বেশি দায়ী করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের সহজলভ্যতা থাকলেও সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।

গ্রন্থের শেষাংশে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে স্মৃতিচারণ লেখকের অভিজ্ঞতার ঝুলি উন্মোচন করে। ইসলামী অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈশ্বিক মুদ্রা সংকটের মতো জটিল বিষয়গুলোকে তিনি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করেছেন। পাশাপাশি আল মাহমুদসহ বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ বইটিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

সামগ্রিকভাবে, ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ গ্রন্থটি সমাজ ও সংস্কৃতির এক বহুমাত্রিক দর্পণ। এটি যেমন তাত্ত্বিক, তেমনি প্রায়োগিক। আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যারা একটি সুস্থ ও চিন্তাশীল সমাজ বিনির্মাণে আগ্রহী, তাদের জন্য শাহ্ আবদুল হালিমের এই বইটি একটি অপরিহার্য পাঠ্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মনন ও সংস্কৃতির পুনর্গঠন: শাহ্ আবদুল হালিমের ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ এক অনন্য সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ০৪:৫৩:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আধুনিক মুসলিম সমাজে সংস্কৃতির স্বরূপ এবং এর বিবর্তন নিয়ে এক গভীর ও তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ উপস্থাপন করেছেন চিন্তাবিদ শাহ্ আবদুল হালিম। তাঁর রচিত ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ গ্রন্থটি কেবল প্রথাগত কোনো আলোচনা নয়, বরং এটি সমকালীন সমাজ, ধর্ম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর এক সমন্বিত পর্যালোচনামূলক দলিল। লেখক এখানে সংস্কৃতিকে কেবল শিল্প বা বিনোদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা, ভাষা ও জীবনদর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চিত্রিত করেছেন।

গ্রন্থটির শুরুতেই লেখক সংস্কৃতির সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর মতে, একটি সমাজের মানসিক ও নৈতিক উন্নতির মাপকাঠি হলো তার সংস্কৃতির গভীরতা। ইসলাম ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির মেলবন্ধন নিয়ে আলোচনায় তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলাম কোনো সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক মডেল চাপিয়ে দেয় না। বরং নৈতিক সীমানার ভেতরে থেকে বিভিন্ন স্থানীয় আচার ও প্রথাকে গ্রহণ করার মাধ্যমে এক ধরনের উদার ও মানবিক বহুত্ববাদকে উৎসাহিত করে। মুসলিম ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এই সাংস্কৃতিক অন্তর্ভুক্তির উদাহরণ দিয়ে তিনি সমকালীন সংকটের মূলে আলোকপাত করেছেন।

শাহ্ আবদুল হালিম বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক সংকটকে আত্মপরিচয়হীনতা এবং ভোগবাদের ফলাফল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, আধুনিক সমাজের নৈতিক বিভ্রান্তি ও অন্ধ অনুকরণপ্রবণতার প্রধান কারণ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা। এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার’-এর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। লেখকের মতে, সংস্কার মানে কেবল বাহ্যিক আচরণ পরিবর্তন নয়, বরং চিন্তাধারা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতার আমূল পরিবর্তন।

বইটিতে সংস্কৃতির রূপান্তর ও বিন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। লেখক স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে, সংস্কৃতি কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বাজার অর্থনীতির প্রভাবে মানুষের রুচি ও অভ্যাসের যে পরিবর্তন ঘটছে, তার একটি সমাজতাত্ত্বিক চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যে সবসময় মানবিক অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয় না, সেই রূঢ় সত্যটিও তিনি তুলে ধরেছেন। এছাড়া সমাজের স্তরভেদে এলিট ও প্রান্তিক সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ পাঠকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান দশা নিয়ে লেখকের সমালোচনা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। শিক্ষা যখন কেবল সনদ অর্জন ও জীবিকা নির্বাহের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেয়। ভাষার সঠিক ব্যবহার এবং শব্দের পরিভাষাগত নির্ভুলতা যে চিন্তার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কতটা জরুরি, তা তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যাখ্যা করেছেন। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি কেবল ক্ষমতার লড়াইকে বড় করে দেখেননি, বরং সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে রাজনীতির অপরিহার্য অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন।

শিল্প, সংগীত এবং তথ্যবিপ্লব নিয়ে শাহ্ আবদুল হালিমের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। মুসলিম সমাজের পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে তিনি কোনো বহিরাগত ষড়যন্ত্রের চেয়ে নিজেদের চিন্তার দৈন্য ও আত্মসমালোচনার অভাবকে বেশি দায়ী করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের সহজলভ্যতা থাকলেও সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবে যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেছেন।

গ্রন্থের শেষাংশে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে স্মৃতিচারণ লেখকের অভিজ্ঞতার ঝুলি উন্মোচন করে। ইসলামী অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস, দারিদ্র্য বিমোচন এবং বৈশ্বিক মুদ্রা সংকটের মতো জটিল বিষয়গুলোকে তিনি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করেছেন। পাশাপাশি আল মাহমুদসহ বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচারণ বইটিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

সামগ্রিকভাবে, ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ গ্রন্থটি সমাজ ও সংস্কৃতির এক বহুমাত্রিক দর্পণ। এটি যেমন তাত্ত্বিক, তেমনি প্রায়োগিক। আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যারা একটি সুস্থ ও চিন্তাশীল সমাজ বিনির্মাণে আগ্রহী, তাদের জন্য শাহ্ আবদুল হালিমের এই বইটি একটি অপরিহার্য পাঠ্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।