আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক বিস্তারিত পরিকল্পনা পেশ করেছে বিএনপি। গত দেড় দশকের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে একটি টেকসই, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই দলটির মূল লক্ষ্য। শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের এই নির্বাচনি অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত ১৫ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অস্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া, উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ব্যয়বহুল স্বল্পমেয়াদি চুক্তির কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল বোঝা তৈরি হয়েছে। এই সংকট উত্তরণে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়ন ও লক্ষ্যমাত্রা
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সঞ্চালন লাইন বাড়িয়ে ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে নেওয়া হবে। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন এবং সিস্টেম লস কমাতে ‘স্মার্ট গ্রিড’ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ভাড়াভিত্তিক ও স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে অদক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির। এছাড়া ‘লিস্ট কস্ট’ বা সর্বনিম্ন ব্যয়ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে গ্রাহক পর্যায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান
জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস ও তেল উত্তোলনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। ইশতেহারে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘বাপেক্স’কে শক্তিশালী করে স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও খনন কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় কোনো শিল্পাঞ্চলে বছরে পাঁচ মিলিয়ন টন তেল পরিশোধন সক্ষমতার একটি নতুন শোধনাগার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয়ে যেকোনো ধরনের গোপন চুক্তি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলো জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্তে পুনর্গঠন করা হবে। এছাড়া জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ট্যারিফ নির্ধারণ প্রক্রিয়া চালুর অঙ্গীকার করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ সুরক্ষা
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানি মিশ্রণের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিএনপি। সৌর বিদ্যুৎ, বায়োগ্যাস ও মাইক্রোগ্রিড প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিতে বিশেষ প্রণোদনা ও কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় পারমাণবিক জ্বালানির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে এবং এই প্রকল্পে কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়ে থাকলে তা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নগর এলাকার পরিবেশ দূষণ কমানোর নতুন পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে দলটি।
বিএনপির মতে, একটি দক্ষ ও স্বচ্ছ জ্বালানি ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতায় গেলে তারা একটি জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই খাতকে ঢেলে সাজাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
রিপোর্টারের নাম 

























