বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে প্রোথিত একটি মৌলিক সত্য হলো, এই রাষ্ট্র কখনোই জনগণের স্বার্থে আপসহীনভাবে কাজ করেনি। এর মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে রাষ্ট্রের জন্মগত কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের দিকে আলোকপাত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র, আইনব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতি মূলত ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার বহন করে। ব্রিটিশ শাসনামলে যে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সেবা নয়, বরং তাদের নিয়ন্ত্রণ, দমন এবং শোষণ। সে সময় মানুষ ছিল ‘সাবজেক্ট’ বা প্রজা, নাগরিক হিসেবে তাদের কোনো মর্যাদা বা অধিকার ছিল না। পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীনতা লাভের পরও, রাষ্ট্রের পতাকা ও সংবিধান বদলালেও এর অন্তর্নিহিত ‘নিয়ন্ত্রণমুখী’ এবং ‘কর্তৃত্ববাদী’ মানসিকতা নতুন রূপে টিকে রয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, একবার গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান নিজস্ব স্বার্থে টিকে থাকতে চায় এবং একই ধারায় এগিয়ে চলে, যতক্ষণ না কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক আলোড়ন সেটিকে ভেঙে দেয়। বাংলাদেশে এমন কোনো ভাঙন কখনো ঘটেনি। ফলে ঔপনিবেশিক ‘নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্র’ আজও ‘সেবার রাষ্ট্রে’ রূপান্তরিত হতে পারেনি। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এই ধরনের রাষ্ট্রকে ‘শোষণকেন্দ্রিক’ বা ‘লুটপাটভিত্তিক’ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে রাষ্ট্রের মূল কাজ জনগণের ক্ষমতায়ন নয়, বরং সম্পদ আহরণ এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা। বাংলাদেশে এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
এখানে একটি শক্তিশালী ‘এলিট কোয়ালিশন’ গড়ে উঠেছে, যেখানে আমলাতন্ত্র, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটি অস্বচ্ছ জোট মিলিতভাবে এক ধরনের ‘ডিপ স্টেট’ নির্মাণ করেছে। এই কাঠামো দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকে প্রকৃত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে এবং রাষ্ট্রকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। এই ‘ডিপ স্টেট’ প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করে জনস্বার্থে নয়, বরং এলিট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন তার নিরপেক্ষ চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতাসীনদের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তৃতীয়ত, ব্যবসা ও রাজনীতির অস্বচ্ছ আঁতাত একটি ‘রেন্ট-সিকিং’ বা প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা আদায়ের অর্থনীতি তৈরি করে, যেখানে উৎপাদন নয়, প্রভাবই স্বার্থ লাভের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
রিপোর্টারের নাম 





















