ঢাকা ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ: ইসলামি শরিয়তের আলোকে চার গুরুত্বপূর্ণ দিক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনী আমেজ। নাগরিক অধিকার হিসেবে ভোট প্রদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এর ধর্মীয় গুরুত্ব ও তাৎপর্য জানাও তেমনই জরুরি। আধুনিক আলেম ও গবেষকদের মতে, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোট প্রদান কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এক আমানত। গবেষক আলেমদের মতে, ভোট দেওয়ার অর্থ মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি পরিভাষার সমন্বিত রূপ।

সাক্ষ্য প্রদান বা শাহাদাত
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়ার প্রথম অর্থ হলো সাক্ষ্য প্রদান করা। একজন ভোটার যখন কোনো প্রার্থীকে ভোট দেন, তখন তিনি মূলত এই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই পদের জন্য যোগ্য এবং তার জানামতে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তিনি অধিকতর শ্রেষ্ঠ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা আনআমের ১৫২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা কোনো কথা বলো, তখন ন্যায়নীতি অবলম্বন করো; এমনকি সে যদি তোমাদের নিকটাত্মীয়ও হয়।’

সুরা নিসা ও সুরা মায়িদাতেও আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো শত্রুতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। ফলে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কেবল আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব বা জাগতিক কোনো মোহের বশবর্তী হয়ে অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া হবে ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ প্রদানের শামিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে অন্যতম কবিরা গুনাহ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি টাকার বিনিময়ে ভোট কেনাবেচা করা হলে তাতে মিথ্যা সাক্ষ্য ও ঘুষ গ্রহণ—এই দুই জঘন্য পাপের সমন্বয় ঘটে।

সুপারিশ বা শাফায়াত
ভোট প্রদানের দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো সুপারিশ। ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করার জন্য সুপারিশ করেন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, ভালো কাজের সুপারিশ করলে সওয়াব এবং মন্দ কাজের সুপারিশ করলে গুনাহ অর্জিত হয়। সুরা নিসার ৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করবে, সে তার অংশ পাবে। আর যে মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, সে তার মন্দ ফলেরও অংশ পাবে।’ সুতরাং একজন যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে তার মাধ্যমে সম্পাদিত জনকল্যাণমূলক কাজের নেকি ভোটারও পাবেন। বিপরীতে অযোগ্য কাউকে বিজয়ী করলে তার অপকর্মের দায়ভার ভোটারের ওপরও বর্তাবে।

প্রতিনিধি নিয়োগ বা ওকালত
ভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা মূলত তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য একজন ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে কাউকে প্রতিনিধি নিয়োগের চেয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্ববহ। কারণ এর সঙ্গে পুরো জাতির অধিকার ও স্বার্থ জড়িত থাকে। কোনো অসৎ বা অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া মানে পুরো জাতির অধিকার নষ্ট করার সুযোগ করে দেওয়া, যা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে চরম অপরাধ।

আমানত রক্ষা
ইসলামি শরিয়তে ভোটাধিকারকে একটি পবিত্র ‘আমানত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের এই গুরুদায়িত্ব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এক আমানত। আমানতদারিতা ঈমানের অন্যতম অঙ্গ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমান নেই। আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের লক্ষণ। তাই যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে আমানত তার সঠিক প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া মানে আমানতের খেয়ানত করা।

পরিশেষে বলা যায়, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’—এই স্লোগানটি ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নাতীত নয়। বরং একজন সচেতন মুসলিমের মূলনীতি হওয়া উচিত—‘আমার ভোট একটি পবিত্র আমানত ও সাক্ষ্য, তাই আমি কেবল যোগ্য ব্যক্তিকেই ভোট দেব।’ দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আল্লাহ আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তৌফিক দান করুন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ: ইসলামি শরিয়তের আলোকে চার গুরুত্বপূর্ণ দিক

আপডেট সময় : ১০:৩৯:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনী আমেজ। নাগরিক অধিকার হিসেবে ভোট প্রদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে এর ধর্মীয় গুরুত্ব ও তাৎপর্য জানাও তেমনই জরুরি। আধুনিক আলেম ও গবেষকদের মতে, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে ভোট প্রদান কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে অত্যন্ত সংবেদনশীল এক আমানত। গবেষক আলেমদের মতে, ভোট দেওয়ার অর্থ মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি পরিভাষার সমন্বিত রূপ।

সাক্ষ্য প্রদান বা শাহাদাত
ইসলামের দৃষ্টিতে ভোট দেওয়ার প্রথম অর্থ হলো সাক্ষ্য প্রদান করা। একজন ভোটার যখন কোনো প্রার্থীকে ভোট দেন, তখন তিনি মূলত এই সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওই পদের জন্য যোগ্য এবং তার জানামতে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তিনি অধিকতর শ্রেষ্ঠ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা আনআমের ১৫২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমরা কোনো কথা বলো, তখন ন্যায়নীতি অবলম্বন করো; এমনকি সে যদি তোমাদের নিকটাত্মীয়ও হয়।’

সুরা নিসা ও সুরা মায়িদাতেও আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো শত্রুতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বশবর্তী হয়ে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। ফলে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কেবল আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব বা জাগতিক কোনো মোহের বশবর্তী হয়ে অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া হবে ‘মিথ্যা সাক্ষ্য’ প্রদানের শামিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্যকে অন্যতম কবিরা গুনাহ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এমনকি টাকার বিনিময়ে ভোট কেনাবেচা করা হলে তাতে মিথ্যা সাক্ষ্য ও ঘুষ গ্রহণ—এই দুই জঘন্য পাপের সমন্বয় ঘটে।

সুপারিশ বা শাফায়াত
ভোট প্রদানের দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো সুপারিশ। ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করার জন্য সুপারিশ করেন। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, ভালো কাজের সুপারিশ করলে সওয়াব এবং মন্দ কাজের সুপারিশ করলে গুনাহ অর্জিত হয়। সুরা নিসার ৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের সুপারিশ করবে, সে তার অংশ পাবে। আর যে মন্দ কাজের সুপারিশ করবে, সে তার মন্দ ফলেরও অংশ পাবে।’ সুতরাং একজন যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে তার মাধ্যমে সম্পাদিত জনকল্যাণমূলক কাজের নেকি ভোটারও পাবেন। বিপরীতে অযোগ্য কাউকে বিজয়ী করলে তার অপকর্মের দায়ভার ভোটারের ওপরও বর্তাবে।

প্রতিনিধি নিয়োগ বা ওকালত
ভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা মূলত তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য একজন ‘উকিল’ বা প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে কাউকে প্রতিনিধি নিয়োগের চেয়ে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধি নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্ববহ। কারণ এর সঙ্গে পুরো জাতির অধিকার ও স্বার্থ জড়িত থাকে। কোনো অসৎ বা অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া মানে পুরো জাতির অধিকার নষ্ট করার সুযোগ করে দেওয়া, যা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে চরম অপরাধ।

আমানত রক্ষা
ইসলামি শরিয়তে ভোটাধিকারকে একটি পবিত্র ‘আমানত’ হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের এই গুরুদায়িত্ব মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত এক আমানত। আমানতদারিতা ঈমানের অন্যতম অঙ্গ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে আমানতদারি নেই, তার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ঈমান নেই। আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের লক্ষণ। তাই যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মানে আমানত তার সঠিক প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আর অযোগ্য কাউকে ভোট দেওয়া মানে আমানতের খেয়ানত করা।

পরিশেষে বলা যায়, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’—এই স্লোগানটি ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নাতীত নয়। বরং একজন সচেতন মুসলিমের মূলনীতি হওয়া উচিত—‘আমার ভোট একটি পবিত্র আমানত ও সাক্ষ্য, তাই আমি কেবল যোগ্য ব্যক্তিকেই ভোট দেব।’ দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আল্লাহ আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তৌফিক দান করুন।