ঢাকা ০২:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

জামালপুর-৩ আসনে জটিল সমীকরণ: ভোট ভাগাভাগি ও বিতর্কিত ইস্যুতে চাপে বিএনপি-জামায়াত

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রমশ জটিল হচ্ছে। ভোটের মাঠ যত উত্তপ্ত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং একটি বিতর্কিত আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উভয় দলকেই ফেলেছে অস্বস্তিতে। দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে হিসাব-নিকাশ, আর পুরো নির্বাচনি এলাকায় বইছে টান টান উত্তেজনা।

ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। মাইকিং, বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর চায়ের আড্ডায় জমে উঠেছে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক। সব মিলিয়ে মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনি উত্তাপ এখন তুঙ্গে।

এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদী। এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের দৌলতুজ্জামান আনসারী, স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) কাপ প্রতীকের সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী শুভ, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের মীর সামছুল আলম লিপটন, মাথাল প্রতীকের ডা. ফিদেল নঈম, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের লিটন মিয়া, সূর্যমুখী ফুল প্রতীকের শিবলুল বারী রাজু এবং ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী ফারজানা ফরিদ পুঁথি। উল্লেখ্য, তিনিই জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী।

যদিও এই আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে চতুর্মুখী ভোটের লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, মূলত হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ও জামায়াতের মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদীর মধ্যে। তবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভ ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় ধানের শীষের ভোট ভাগ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন একটি সমবায় সমিতির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দলটিকে চাপের মুখে ফেলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রভাব থাকলেও, দলটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় মাঠ এখন উন্মুক্ত। এর ফলে বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলকে বিনা চ্যালেঞ্জে এগোতে হচ্ছে না। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী শুভর সক্রিয়তা ভোট বিভক্তির আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানান, “এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। যেখানেই যাচ্ছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। জনগণ পরিবর্তন চায়। আমি নির্বাচিত হলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ গড়ে তুলব।”

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদী দাবি করেন, “গণসংযোগে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বিজয়ী হবে।”

বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী শুভ বলেন, “আমি মনে করি, একটি গণতান্ত্রিক দেশে সব ক্ষমতা জনগণের হাতে। সেই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা অপশক্তিকে পরাজিত করব।”

মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদ ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রদল নেতা জুলফিকার মোহাম্মদ শিপন মনে করেন, “যেকোনো হিসাবই করা হোক না কেন, ধানের শীষের জয় অনেকটাই নিশ্চিত। মানুষ একবার ভোট দিয়ে এমপি বানিয়েও সংসদে পাঠাতে পারেনি; এবার সেই আক্ষেপ ঘুচাতে চায়।” বিএনপি নেতাকর্মীরাও দাবি করছেন যে, বিদ্রোহী প্রার্থী তাদের ভোট ব্যাংকে খুব বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন না। দুই উপজেলাতেই ধানের শীষের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে।

মাদারগঞ্জের জোনাইল এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, “বিএনপি এখনও এই আসনে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। জামায়াতও এখানে বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। এ আসনে দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।”

তবে মাদারগঞ্জে বহিষ্কৃত জামায়াত নেতাদের পরিচালিত একটি সমবায় সমিতির প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নির্বাচনি মাঠে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যা জামায়াতের জন্য অস্বস্তির কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, শেষ পর্যন্ত লড়াই সীমিত থাকবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বিতর্কিত ইস্যুগুলো ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দিলালেরপাড়া এলাকার সাইদুর রহমান জানান, বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এলাকায় ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। তবে প্রার্থী সংখ্যা যতই হোক, শেষ পর্যায়ে জয় সম্ভবত বিএনপি বা জামায়াতেরই হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের পাল্টা হামলা: ইসরাইলের জ্বালানি অবকাঠামো ও যোগাযোগ কেন্দ্রে আঘাত

জামালপুর-৩ আসনে জটিল সমীকরণ: ভোট ভাগাভাগি ও বিতর্কিত ইস্যুতে চাপে বিএনপি-জামায়াত

আপডেট সময় : ১১:০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রমশ জটিল হচ্ছে। ভোটের মাঠ যত উত্তপ্ত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং একটি বিতর্কিত আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উভয় দলকেই ফেলেছে অস্বস্তিতে। দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে পাল্টে যাচ্ছে হিসাব-নিকাশ, আর পুরো নির্বাচনি এলাকায় বইছে টান টান উত্তেজনা।

ভোটারদের মন জয় করতে প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। মাইকিং, বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিফলেট বিতরণ এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর চায়ের আড্ডায় জমে উঠেছে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক। সব মিলিয়ে মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনি উত্তাপ এখন তুঙ্গে।

এই আসনে মোট ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এবং জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদী। এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের দৌলতুজ্জামান আনসারী, স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) কাপ প্রতীকের সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী শুভ, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের মীর সামছুল আলম লিপটন, মাথাল প্রতীকের ডা. ফিদেল নঈম, গণঅধিকার পরিষদের ট্রাক প্রতীকের লিটন মিয়া, সূর্যমুখী ফুল প্রতীকের শিবলুল বারী রাজু এবং ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী ফারজানা ফরিদ পুঁথি। উল্লেখ্য, তিনিই জেলার পাঁচটি আসনের মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী।

যদিও এই আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে চতুর্মুখী ভোটের লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, মূলত হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল ও জামায়াতের মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদীর মধ্যে। তবে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভ ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকায় ধানের শীষের ভোট ভাগ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন একটি সমবায় সমিতির অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দলটিকে চাপের মুখে ফেলেছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই আসনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রভাব থাকলেও, দলটি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় মাঠ এখন উন্মুক্ত। এর ফলে বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলকে বিনা চ্যালেঞ্জে এগোতে হচ্ছে না। দলের বিদ্রোহী প্রার্থী শুভর সক্রিয়তা ভোট বিভক্তির আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিএনপির প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানান, “এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক। যেখানেই যাচ্ছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। জনগণ পরিবর্তন চায়। আমি নির্বাচিত হলে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ গড়ে তুলব।”

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদী দাবি করেন, “গণসংযোগে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বিজয়ী হবে।”

বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী শুভ বলেন, “আমি মনে করি, একটি গণতান্ত্রিক দেশে সব ক্ষমতা জনগণের হাতে। সেই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা অপশক্তিকে পরাজিত করব।”

মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদ ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রদল নেতা জুলফিকার মোহাম্মদ শিপন মনে করেন, “যেকোনো হিসাবই করা হোক না কেন, ধানের শীষের জয় অনেকটাই নিশ্চিত। মানুষ একবার ভোট দিয়ে এমপি বানিয়েও সংসদে পাঠাতে পারেনি; এবার সেই আক্ষেপ ঘুচাতে চায়।” বিএনপি নেতাকর্মীরাও দাবি করছেন যে, বিদ্রোহী প্রার্থী তাদের ভোট ব্যাংকে খুব বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন না। দুই উপজেলাতেই ধানের শীষের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যাচ্ছে।

মাদারগঞ্জের জোনাইল এলাকার বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, “বিএনপি এখনও এই আসনে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি। জামায়াতও এখানে বেশ ভালো অবস্থান তৈরি করেছে। এ আসনে দুই দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।”

তবে মাদারগঞ্জে বহিষ্কৃত জামায়াত নেতাদের পরিচালিত একটি সমবায় সমিতির প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নির্বাচনি মাঠে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যা জামায়াতের জন্য অস্বস্তির কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, শেষ পর্যন্ত লড়াই সীমিত থাকবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বিতর্কিত ইস্যুগুলো ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। দিলালেরপাড়া এলাকার সাইদুর রহমান জানান, বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এলাকায় ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছেন। তবে প্রার্থী সংখ্যা যতই হোক, শেষ পর্যায়ে জয় সম্ভবত বিএনপি বা জামায়াতেরই হবে।