জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে করা একটি বিতর্কিত পোস্টকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে পাল্টাপাল্টি যুক্তি ও তীব্র সমালোচনা। জামায়াতে ইসলামী বিষয়টিকে সুপরিকল্পিত ‘ষড়যন্ত্র ও হ্যাকিং’ হিসেবে দাবি করলেও, এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি। এমনকি এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার বিকেলে, যখন ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিয়ে একটি আপত্তিকর পোস্ট জনসমক্ষে আসে। পোস্টটিতে নারীদের ঘরের বাইরে আসাকে ‘শোষণ ও নৈতিক অবক্ষয়’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ও বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। দলটির দাবি, তাদের আমিরের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেলটি একটি কুচক্রী মহল হ্যাক করেছিল। হ্যাকাররা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমিরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে এই আপত্তিকর পোস্টটি দেয়। জামায়াত আরও অভিযোগ করেছে যে, এই হ্যাকিং প্রক্রিয়ায় বঙ্গভবনের (রাষ্ট্রপতির কার্যালয়) একজন কর্মকর্তার সরকারি ইমেইল আইডি ব্যবহার করা হয়েছে।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিষয়টি নজরে আসার পরপরই তাদের আইটি টিম অ্যাকাউন্টটি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে এবং তদন্তের জন্য নির্বাচন কমিশন ও সাইবার ট্রাইব্যুনালকেও অবহিত করা হয়েছে। জামায়াতের দাবি, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরায় দেওয়া আমিরের একটি সাক্ষাৎকারের বক্তব্যকে বিকৃত করে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, জামায়াতের এই ‘হ্যাকিং’ দাবিকে নাকচ করে দিয়ে কড়া সমালোচনা করেছে বিএনপি। দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহদী আমিন এক বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলেন, পোস্টটি করার দীর্ঘ সময় পর কেন হ্যাকিংয়ের দাবি তোলা হলো? তিনি মন্তব্য করেন, জনগণের ক্ষোভের মুখে পড়ে এখন হ্যাকিংয়ের অজুহাত দেওয়া হচ্ছে যা কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিএনপি বিষয়টিকে ‘মধ্যযুগীয় ও নারীবিদ্বেষী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদল এই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করে এবং জামায়াত আমিরের বক্তব্যকে নারী অবমাননাকর বলে দাবি করে।
এ বিষয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে শেরপুরের এক নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “একটি অপশক্তি আমার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে মা-বোনদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ছড়িয়েছে। যারা এই কাজ করেছে তারা কাপুরুষ ও ইতরশ্রেণির।” তিনি আরও জানান, অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে সতর্ক করে বলেন, তার এই দুঃখ প্রকাশ যেন ‘ভুল স্বীকার’ হিসেবে প্রচার না করা হয়।
বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। জামায়াত যেখানে একে ডিজিটাল স্যাবোটাজ হিসেবে দেখছে, সেখানে বিরোধী পক্ষ একে দেখছে দলটির প্রকৃত আদর্শের প্রতিফলন হিসেবে। সাইবার বিশারদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমেই এই রহস্যের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























