ঢাকা ০২:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

পর্যাপ্ত মজুত সত্ত্বেও পাম্পে অকটেনের হাহাকার: কারণ কী?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩৯:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে যখন অকটেন পেতে দীর্ঘ লাইন এবং গ্রাহকদের হাহাকার চলছে, ঠিক তখনই সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে যে তাদের কাছে চাহিদার চেয়েও বেশি অকটেন মজুত রয়েছে। গতকাল ২০ এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বিপিসির হাতে যে পরিমাণ অকটেন আছে, তা দিয়ে অনায়াসেই আগামী ৪৫ দিন দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এমনকি মজুত রাখার সক্ষমতা পার হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত অকটেন সংরক্ষণে বিপিসিকে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অকটেনের মজুত ও আমদানির বর্তমান অবস্থা

বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে অকটেন ব্যবস্থাপনার চিত্রটি নিম্নরূপ:

  • মজুত সক্ষমতা: সারাদেশে বিপিসির অকটেন ধারণক্ষমতা ৫৩,৩৬১ মেট্রিক টন।
  • বর্তমান মজুত: ২০ এপ্রিল সকালে মজুত ছিল ২৭,৬১২ টন। এর বাইরেও চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৪ হাজার টন অকটেন নিয়ে দুটি জাহাজ (‘এমটি সেন্ট্রাল স্টার’ ও ‘এমটি নেভি সিয়েলো’) অবস্থান করছে।
  • সরবরাহ ক্ষমতা: বর্তমান মজুত এবং আমদানিকৃত তেল খালাস হলে বিপিসি আগামী ৭৮ দিন নিরবচ্ছিন্ন অকটেন সরবরাহ করতে পারবে।
  • অতিরিক্ত মজুত সমস্যা: চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৯ হাজার টন বেশি অকটেন হাতে থাকায় বিপিসিকে এখন জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ট্যাংক প্রস্তুত করতে হচ্ছে।

সংকট ও অভিযোগের নেপথ্যে

পাম্পগুলোতে তেলের ঘাটতির পেছনে কয়েকটি পরস্পরবিরোধী তথ্য উঠে এসেছে:

  1. বিপিসির কৌশলী সরবরাহ: বিপিসি সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে শুরুতে কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করলেও এখন ২০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব এখনো পড়েনি।
  2. বেসরকারি প্ল্যান্টের অভিযোগ: বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ দাবি করেছে যে তারা তেল উৎপাদন করে বসে থাকলেও বিপিসি তা সময়মতো গ্রহণ করছে না। তাদের মতে, সরবরাহ না নিলে তারা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
  3. বিপিসির ‘সাবোটাজ’ দাবি: বিপিসি এই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘সাবোটাজ’ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশি দামে তেল বিক্রির জন্য বিপিসিকে চাপ দিচ্ছে।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম (১৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর)

ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে:

  • অকটেন: ১৪০ টাকা (লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি)
  • পেট্রোল: ১৩৫ টাকা (লিটারে ১৯ টাকা বৃদ্ধি)
  • ডিজেল: ১১৫ টাকা (লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি)
  • কেরোসিন: ১৩০ টাকা (লিটারে ১৮ টাকা বৃদ্ধি)

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মনজারে খোরশেদ আলম মনে করেন, যেহেতু বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দামও বাড়ানো হয়েছে, তাই সরবরাহ আর সীমিত রাখা উচিত নয়। পাম্পগুলোতে সরবরাহ অবারিত করে দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক (Panic) দ্রুত কেটে যাবে এবং দীর্ঘ লাইনও কমে আসবে। তার মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক করলে অবৈধভাবে তেল মজুতের প্রবণতাও বন্ধ হবে।

বিপিসি দাবি করছে যে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি নেই এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও তেলের পার্সেল আসায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। তবে গ্রাহক পর্যায়ে এই আশ্বাসের প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাবি হোস্টেলে ফের গেস্টরুমের নামে নির্যাতনের অভিযোগ

পর্যাপ্ত মজুত সত্ত্বেও পাম্পে অকটেনের হাহাকার: কারণ কী?

আপডেট সময় : ১২:৩৯:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

সারাদেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে যখন অকটেন পেতে দীর্ঘ লাইন এবং গ্রাহকদের হাহাকার চলছে, ঠিক তখনই সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দাবি করছে যে তাদের কাছে চাহিদার চেয়েও বেশি অকটেন মজুত রয়েছে। গতকাল ২০ এপ্রিল ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বিপিসির হাতে যে পরিমাণ অকটেন আছে, তা দিয়ে অনায়াসেই আগামী ৪৫ দিন দেশের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এমনকি মজুত রাখার সক্ষমতা পার হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত অকটেন সংরক্ষণে বিপিসিকে এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে।

অকটেনের মজুত ও আমদানির বর্তমান অবস্থা

বিপিসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে অকটেন ব্যবস্থাপনার চিত্রটি নিম্নরূপ:

  • মজুত সক্ষমতা: সারাদেশে বিপিসির অকটেন ধারণক্ষমতা ৫৩,৩৬১ মেট্রিক টন।
  • বর্তমান মজুত: ২০ এপ্রিল সকালে মজুত ছিল ২৭,৬১২ টন। এর বাইরেও চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৪ হাজার টন অকটেন নিয়ে দুটি জাহাজ (‘এমটি সেন্ট্রাল স্টার’ ও ‘এমটি নেভি সিয়েলো’) অবস্থান করছে।
  • সরবরাহ ক্ষমতা: বর্তমান মজুত এবং আমদানিকৃত তেল খালাস হলে বিপিসি আগামী ৭৮ দিন নিরবচ্ছিন্ন অকটেন সরবরাহ করতে পারবে।
  • অতিরিক্ত মজুত সমস্যা: চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৯ হাজার টন বেশি অকটেন হাতে থাকায় বিপিসিকে এখন জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ট্যাংক প্রস্তুত করতে হচ্ছে।

সংকট ও অভিযোগের নেপথ্যে

পাম্পগুলোতে তেলের ঘাটতির পেছনে কয়েকটি পরস্পরবিরোধী তথ্য উঠে এসেছে:

  1. বিপিসির কৌশলী সরবরাহ: বিপিসি সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে শুরুতে কিছুটা কৃচ্ছ্রসাধন করলেও এখন ২০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব এখনো পড়েনি।
  2. বেসরকারি প্ল্যান্টের অভিযোগ: বেসরকারি ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ দাবি করেছে যে তারা তেল উৎপাদন করে বসে থাকলেও বিপিসি তা সময়মতো গ্রহণ করছে না। তাদের মতে, সরবরাহ না নিলে তারা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
  3. বিপিসির ‘সাবোটাজ’ দাবি: বিপিসি এই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘সাবোটাজ’ বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বেশি দামে তেল বিক্রির জন্য বিপিসিকে চাপ দিচ্ছে।

জ্বালানি তেলের নতুন দাম (১৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর)

ব্যয়ের চাপ সামলাতে সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে:

  • অকটেন: ১৪০ টাকা (লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধি)
  • পেট্রোল: ১৩৫ টাকা (লিটারে ১৯ টাকা বৃদ্ধি)
  • ডিজেল: ১১৫ টাকা (লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি)
  • কেরোসিন: ১৩০ টাকা (লিটারে ১৮ টাকা বৃদ্ধি)

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার মনজারে খোরশেদ আলম মনে করেন, যেহেতু বর্তমানে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং দামও বাড়ানো হয়েছে, তাই সরবরাহ আর সীমিত রাখা উচিত নয়। পাম্পগুলোতে সরবরাহ অবারিত করে দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক (Panic) দ্রুত কেটে যাবে এবং দীর্ঘ লাইনও কমে আসবে। তার মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক করলে অবৈধভাবে তেল মজুতের প্রবণতাও বন্ধ হবে।

বিপিসি দাবি করছে যে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি নেই এবং আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও তেলের পার্সেল আসায় পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। তবে গ্রাহক পর্যায়ে এই আশ্বাসের প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়।