ঢাকা ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আইনের শাসন ও চট্টগ্রাম বন্দর: আদালতের রায়ের পর অস্থিতিশীলতা কি কাম্য?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫৪:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হলো আইনের শাসন। যখন কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায় প্রদান করে, তখন সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সর্বশেষ রায় সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকেই স্পষ্ট করেছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬) বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন—এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর চুক্তিতে কোনো আইনগত বাধা নেই। এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আইনি বিতর্কের অবসান ঘটলেও, এর প্রতিবাদে শ্রমিক সংগঠনগুলোর বন্দর অচল করার ডাক রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আদালতের রায়

এনসিটি পরিচালনা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে এ বিষয়ে বিভক্ত রায় এসেছিল। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি চুক্তিটিকে অবৈধ মনে করলেও কনিষ্ঠ বিচারপতি একে বৈধ ঘোষণা করেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান। দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত রায় দিয়েছেন যে, ২০১৭ সালের প্রকিউরমেন্ট পলিসি ও পিপিপি আইন মেনেই এই চুক্তি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এটি প্রমাণ করে—বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শ্রমিকদের আন্দোলন ও জাতীয় অর্থনীতির ঝুঁকি

আদালতের রায়ের পরপরই ‘চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল’সহ বিভিন্ন সংগঠন শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে। এর ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো—আদালতের রায়ের পর এই কর্মসূচি কি আইনত বৈধ? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আন্দোলনের অধিকার থাকলেও তা আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ করার লাইসেন্স হতে পারে না।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। একদিন বন্দর বন্ধ থাকা মানে শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক ক্ষতি, শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়া। এই ধর্মঘট আসলে সরকারকে নয়, বরং সাধারণ মানুষ ও জাতীয় অর্থনীতিকেই জিম্মি করছে।

সার্বভৌমত্ব বনাম দক্ষতা

শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি—বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনাল দিলে সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। তবে বাস্তবতা হলো, সিঙ্গাপুর, রটারডাম বা দুবাইয়ের মতো বিশ্বের বড় বড় বন্দরগুলো বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় এবং তাতে কোনো দেশই তার সার্বভৌমত্ব হারায়নি। এনসিটির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকছে; এটি কেবল একটি ম্যানেজমেন্ট কন্ট্রাক্ট বা পরিচালনা চুক্তি, যেখানে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হিসেবে রাষ্ট্রই থাকছে।

উপসংহার ও করণীয়

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই নীতিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। আদালতের রায় মেনে নেওয়াই আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। শ্রমিকদের কোনো উদ্বেগ থাকলে তা আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা উচিত, বন্দর অচল করে নয়। ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং কয়েকজন নেতাকে বদলিও করা হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে এবং জাতীয় অর্থনীতি সচল রাখতে রাষ্ট্রকে এখানে কঠোর ও সংবিধানসম্মত অবস্থান নিতে হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

আইনের শাসন ও চট্টগ্রাম বন্দর: আদালতের রায়ের পর অস্থিতিশীলতা কি কাম্য?

আপডেট সময় : ১২:৫৪:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ হলো আইনের শাসন। যখন কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালত চূড়ান্ত রায় প্রদান করে, তখন সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সর্বশেষ রায় সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকেই স্পষ্ট করেছে।

গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি ২০২৬) বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন—এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর চুক্তিতে কোনো আইনগত বাধা নেই। এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের আইনি বিতর্কের অবসান ঘটলেও, এর প্রতিবাদে শ্রমিক সংগঠনগুলোর বন্দর অচল করার ডাক রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও আদালতের রায়

এনসিটি পরিচালনা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াটি কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চে এ বিষয়ে বিভক্ত রায় এসেছিল। জ্যেষ্ঠ বিচারপতি চুক্তিটিকে অবৈধ মনে করলেও কনিষ্ঠ বিচারপতি একে বৈধ ঘোষণা করেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান। দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত রায় দিয়েছেন যে, ২০১৭ সালের প্রকিউরমেন্ট পলিসি ও পিপিপি আইন মেনেই এই চুক্তি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এটি প্রমাণ করে—বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শ্রমিকদের আন্দোলন ও জাতীয় অর্থনীতির ঝুঁকি

আদালতের রায়ের পরপরই ‘চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল’সহ বিভিন্ন সংগঠন শনিবার (৩১ জানুয়ারি) ও রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে। এর ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো—আদালতের রায়ের পর এই কর্মসূচি কি আইনত বৈধ? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আন্দোলনের অধিকার থাকলেও তা আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ করার লাইসেন্স হতে পারে না।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। একদিন বন্দর বন্ধ থাকা মানে শত কোটি টাকার বাণিজ্যিক ক্ষতি, শিল্পকারখানায় কাঁচামাল সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়া। এই ধর্মঘট আসলে সরকারকে নয়, বরং সাধারণ মানুষ ও জাতীয় অর্থনীতিকেই জিম্মি করছে।

সার্বভৌমত্ব বনাম দক্ষতা

শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি—বিদেশি কোম্পানির হাতে টার্মিনাল দিলে সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। তবে বাস্তবতা হলো, সিঙ্গাপুর, রটারডাম বা দুবাইয়ের মতো বিশ্বের বড় বড় বন্দরগুলো বিদেশি অপারেটরদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয় এবং তাতে কোনো দেশই তার সার্বভৌমত্ব হারায়নি। এনসিটির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকছে; এটি কেবল একটি ম্যানেজমেন্ট কন্ট্রাক্ট বা পরিচালনা চুক্তি, যেখানে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হিসেবে রাষ্ট্রই থাকছে।

উপসংহার ও করণীয়

আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই নীতিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা। আদালতের রায় মেনে নেওয়াই আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। শ্রমিকদের কোনো উদ্বেগ থাকলে তা আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করা উচিত, বন্দর অচল করে নয়। ইতোমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এবং কয়েকজন নেতাকে বদলিও করা হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে এবং জাতীয় অর্থনীতি সচল রাখতে রাষ্ট্রকে এখানে কঠোর ও সংবিধানসম্মত অবস্থান নিতে হবে।