নবম জাতীয় বেতন কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দুই থেকে আড়াই গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরকারি বেতন বৃদ্ধির হার সাধারণত ১০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বাংলাদেশে ১০০ থেকে প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর এই সুপারিশকে অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উচ্চহারের বেতন বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অবাধ লুটপাট, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক গতিতে ফিরতে পারেনি। বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অর্থ কাটছাঁট এবং সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ক্রমবর্ধমান ঋণ গ্রহণের এই সময়ে উচ্চহারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পে কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক অর্থ সচিব জাকির হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অষ্টম পে কমিশন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে, যা ২০২৭ অর্থবছরে বাস্তবায়িত হতে পারে। এর আগে ২০১৬ সালে সপ্তম কমিশনের সুপারিশে দেশটিতে প্রায় ২৩.৫ শতাংশ বেতন বেড়েছিল। পাকিস্তানে বাজেট কাঠামোর মাধ্যমে বেতন বাড়ানো হয়; সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তাদের ১০ শতাংশ এবং অবসরপ্রাপ্তদের ৭ শতাংশ বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাতা দেওয়া হয়েছে। নেপালে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে ২০১৫ সালে অষ্টম পে কমিশনের সুপারিশে ৯১ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হয়েছিল। বেতন কাঠামোতে পরিবর্তন না এলেও, মূল্যস্ফীতির কারণে প্রতি বছরই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়।
গত ২১ জানুয়ারি জাতীয় বেতন কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তাতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হয় এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এই অতিরিক্ত অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন এবং জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার এই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে না। বিষয়টি আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া এই সুপারিশ পরবর্তী সরকারের জন্য একটি ‘সংকট’ তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ এটিকে ‘অ্যাডভান্স ব্ল্যাকমেইলিং’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যে কাজটি বর্তমান সরকার করবে না, তার বোঝা আগামী সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে এটি নাকচ হলে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ আমলাদের অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি অযৌক্তিক নয়, তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর যৌক্তিকতা ও সময়োপযোগিতা বিবেচনা করা উচিত। বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি হলেও, অর্থনীতির শ্লথগতির কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হলেও, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা এই অর্থবছরের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রার ৫৭.৪৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই এর অর্ধেকের বেশি ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, ব্যয় সামলাতে গিয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১৩.২ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হলে আগামীতে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ধরনের বরাদ্দ কমার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সরকারের অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ আরও কমতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার তো আর টাকা ছাপিয়ে বেতন বাড়াতে পারবে না, বা বিদেশ থেকে ঋণ নিয়েও এটা করতে পারবে না। তাহলে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্থায়ন কোথা থেকে হবে? সরকারকে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, কিন্তু আমাদের রাজস্ব আয়ের হার কর-জিডিপির তুলনায় খুবই কম। এ অবস্থায় এ ধরনের বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হবে। এছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়লে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও বেতন বৃদ্ধির চাপ পড়বে এবং জাতীয়করণের দাবিগুলো আরও জোরালো হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বিনিয়োগ কম, মূল্যস্ফীতি বেশি, সরকারের রাজস্ব আহরণেও দুর্বলতা রয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের নভেম্বর মাসে এলডিসি উত্তরণেরও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের বেশি এবং ব্যাংকের সুদের হারও বেশি। এ সময়ে যদি আরও বাড়তি খরচ যুক্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সুতরাং, এমন একটি সময়ে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ কতটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এটি একটি বড় প্রশ্ন।
রিপোর্টারের নাম 























