আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার শিরোনামে ৩৬ দফা অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে এক হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। এনসিপির এই ইশতেহারে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূরীকরণ, অর্থনৈতিক সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ ও নারীর ক্ষমতায়নকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দলটির ঘোষিত ৩৬ দফা ইশতেহারের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
বিচার ও সুশাসন:
এনসিপি তাদের ইশতেহারে জুলাই সনদের আইন ও আদেশ-নির্ভর দফাগুলো বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সময়ে সংঘটিত সব মানবতাবিরোধী অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে একটি ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। ধর্মবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন এবং জাতি-পরিচয়ের কারণে যেকোনো বৈষম্যমূলক আচরণ প্রতিরোধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন মানবাধিকার কমিশনের বিশেষ সেল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। মন্ত্রী, এমপিসহ সকল জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বাৎসরিক আয় ও সম্পদের হিসাব, সরকারি ব্যয় ও বরাদ্দের বিস্তারিত ‘হিসাব দাও’ পোর্টালে প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আমলাতন্ত্রে ল্যাটেরাল এন্ট্রি বৃদ্ধি এবং স্বাধীন পদোন্নতি কমিশনের মাধ্যমে শতভাগ কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান:
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ, বাধ্যতামূলক কর্ম-সুরক্ষা বীমা ও পেনশন নিশ্চিত করে শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। টিসিবির বিদ্যমান এক কোটি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থাকে ট্রাকে লাইনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নিবন্ধিত মুদি দোকানে ব্যবহারযোগ্য করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা কমিয়ে, কর ফাঁকি বন্ধ করে কর-জিডিপি ১২%-এ উন্নীত করা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করে ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, এসএমই খাতে ক্যাশফ্লো-ভিত্তিক ঋণ, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, নিবন্ধন খরচ হ্রাস ও প্রথম ৫ বছরের করমুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ৬%-এ নামানো, ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর অর্থনৈতিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ করা এবং রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য:
শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন করে বিদ্যমান সকল ধরনের শিক্ষার মাধ্যম ও পদ্ধতিগুলোর একটি যৌক্তিক সমন্বয় করা হবে। শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন ও ৫ বছরে ৭৫% এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। উচ্চশিক্ষার সাথে কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করতে স্নাতক পর্যায়ে ৬ মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ/থিসিস রিসার্চ বাধ্যতামূলক করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে হৃদরোগ, ক্যান্সার, ট্রমা, বন্ধ্যাত্ব ও জটিল অস্ত্রোপচারসহ দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা জোন (এসএইচজেড) গড়ে তোলার মাধ্যমে বিদেশে মেডিকেল ট্যুরিজমের বিকল্প তৈরির কথা বলা হয়েছে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সার্বজনীন জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের জন্য জিপিএস-ট্র্যাকড জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স ও প্রি-হসপিটাল এমার্জেন্সি সিস্টেম গঠন করা হবে। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এনআইডি ভিত্তিক ডিজিটাল হেলথ রেকর্ড এবং কার্যকর রেফারেল সিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসার অঙ্গীকার করেছে এনসিপি।
নারী ও তারুণ্য:
নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নিম্নকক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে, যা রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে হ্রাস পাবে। সকল প্রতিষ্ঠানে পূর্ণবেতনে ৬ মাস মাতৃত্বকালীন ও ১ মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক এবং সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ চালু ও ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। ভোটাধিকারের বয়স ১৬ বছর করা হবে এবং তরুণদের কণ্ঠকে প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর করতে ইয়ুথ সিভিক কাউন্সিল গঠন করা হবে।
প্রবাসী ও প্রতিবন্ধী কল্যাণ:
প্রবাসীদের জন্য একটি ‘ডায়াস্পোরা ডিজিটাল পোর্টাল’ (ওয়ান-স্টপ সার্ভিস) গড়ে তোলা হবে, যেখানে পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কনস্যুলার সেবা, বিনিয়োগ ইত্যাদি সবকিছু অনলাইনে করা যাবে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের পরিমাণের বিপরীতে বিনিয়োগ ও পেনশন সুবিধা এবং বিমানে ‘রেমিট মাইলস’ নামে ট্রাভেল মাইলস প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবন্ধী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এনসিপি।
পরিবেশ ও কৃষি:
দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ, পরিচ্ছন্ন যানবাহন ও সবুজ প্রযুক্তি নিশ্চিত করা হবে। পাঁচ বছরে বিদ্যুতের অন্তত ২৫% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন এবং সরকারি ক্রয়ে ৪০% ইলেকট্রিক ভেহিকল চালু করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। দেশের সকল শিল্পকারখানায় ইটিপি (ETP) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং এর ব্যয় কমাতে কর ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। এনআইডি-ভিত্তিক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরাসরি ক্যাশব্যাকের মাধ্যমে সার, বীজ ও যন্ত্রে ভর্তুকি দেওয়া হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও বিক্রয় কেন্দ্র, মাল্টিপারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও ওয়্যারহাউজ স্থাপন করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য ক্রয় নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বৈদেশিক সম্পর্ক ও প্রতিরক্ষা:
ভারতের সাথে সীমান্ত হত্যা, আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা, শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা, অসম চুক্তিসহ সকল বিদ্যমান ইস্যুতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আদালতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক সমাধান ও আসিয়ানে যুক্ত হয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছে দলটি। সশস্ত্র বাহিনীর জন্য রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুণ আকারের রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। পাঁচ বছরে সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি (আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল) ব্রিগেড গঠন ও মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























