মহান আল্লাহতায়ালার অশেষ রহমত ও করুণার এক অনন্য নিদর্শন হলো শবেবরাত বা মধ্য শাবানের রজনী। বছরের বিভিন্ন সময়ে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির জন্য বিশেষ কিছু মুহূর্তকে মহিমান্বিত করেছেন, যার মধ্যে এই রাতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামি আইনবিদ ও গবেষকদের মতে, এটি কেবল ইবাদতের রাত নয়, বরং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক বিশুদ্ধ হাদিস থেকে এই রাতের গুরুত্ব প্রমাণিত। বর্ণিত আছে যে, মধ্য শাবানের রাতে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। এই বিশেষ ঘোষণা থেকে স্পষ্ট হয় যে, মহান আল্লাহর অবারিত ক্ষমা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো দুটি—শিরক ও হিংসা।
ইসলামি দর্শনে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহর কাছে বাহ্যিক আমলের চেয়ে অন্তরের স্বচ্ছতা ও পবিত্রতার মূল্য অনেক বেশি। শিরক বা স্রষ্টার সঙ্গে কাউকে শরিক করা কেবল একটি পাপ নয়, বরং এটি স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির চরম অবজ্ঞা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। একইভাবে, হিংসা ও বিদ্বেষ মানুষের ভেতরকার ইতিবাচক গুণাবলিকে ধ্বংস করে দেয়। এটি সৃষ্টির অধিকার বা ‘হক্কুল ইবাদ’ নষ্ট করার অন্যতম প্রধান কারণ। যার হৃদয়ে অন্যের প্রতি ঘৃণা বা শত্রুতা থাকে, সে প্রকৃত কল্যাণের পথে অগ্রসর হতে পারে না।
হাদিস শরিফে হিংসাকে একটি বিধ্বংসী ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন যে, হিংসা মানুষের নেক আমল বা পুণ্যকে সেভাবেই গ্রাস করে, যেভাবে আগুন শুকনো কাঠকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। মুমিনের হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা কখনো একত্রে অবস্থান করতে পারে না। একজন প্রকৃত বিশ্বাসী সর্বদা অন্যের কল্যাণকামী হন এবং তার হৃদয় থাকে সব ধরনের কলুষতা থেকে মুক্ত।
শবেবরাতের এই মহিমান্বিত রজনীতে ক্ষমা লাভের অন্যতম শর্ত হলো ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার মহান আল্লাহর দরবারে মানুষের আমল পেশ করা হয় এবং পরম করুণাময় সবাইকে ক্ষমা করেন, কেবল তাদের ছাড়া যারা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। যতক্ষণ না তারা বিবাদ মিটিয়ে পুনরায় মিলে যায়, ততক্ষণ তাদের ক্ষমা স্থগিত রাখা হয়।
সুতরাং, শবেবরাত কেবল প্রথাগত কোনো উৎসব নয়; এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শুদ্ধতা চর্চার অঙ্গীকার। এই রাতের শিক্ষা হলো—অন্তরকে শিরকের অন্ধকার থেকে মুক্ত রাখা এবং হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা। যদি আমরা আমাদের হৃদয়কে পঙ্কিলতামুক্ত করে স্রষ্টা ও সৃষ্টির অধিকারের প্রতি সচেতন হতে পারি, তবেই আমাদের জীবন হবে সার্থক এবং মহান রবের দয়া ও ক্ষমার বারিধারায় আমরা প্রতিনিয়ত সিক্ত হতে পারব।
পরিশেষে, শবেবরাতের মূল বার্তা হলো আত্মোপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধি। এই রাতে মহান আল্লাহর রহমতের যে দ্বার উন্মোচিত হয়, তার পূর্ণ সুফল পেতে হলে আমাদের হৃদয়পাত্রকে উপযুক্ত করতে হবে। হিংসা ও অহংকারমুক্ত একটি নির্মল হৃদয়ই পারে মহান আল্লাহর প্রিয় হতে এবং জান্নাতের পথে এগিয়ে যেতে।
রিপোর্টারের নাম 

























