ইসলামি জীবনদর্শনে নেতৃত্ব কেবল একটি পদমর্যাদা বা ক্ষমতার নাম নয়, বরং এটি একটি মহান দায়িত্ব ও পবিত্র আমানত। চাইলেই কেউ নেতা হতে পারেন না, কিংবা কেবল অর্থবিত্ত ও জনবল থাকলেই নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জিত হয় না। ইসলামে নেতৃত্বের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু গুণাবলি ও নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা ইউসুফের ৫৫ নম্বর আয়াতে নেতৃত্বের মৌলিক দুটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান এবং আমানতদারিতা বা সততা থাকা অপরিহার্য। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তির জন্য সেই বিষয়ের ওপর পর্যাপ্ত দক্ষতা থাকা জরুরি। কারণ, দক্ষতা ছাড়া অর্পিত দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করা অসম্ভব। অন্যদিকে, নৈতিক স্খলন বা আমানতদারিতার অভাব থাকলে সেই নেতৃত্ব জনকল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস অনুযায়ী, যার আমানতদারিতা নেই, তার ইমানের পূর্ণতা নেই।
নেতৃত্বের জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও একটি বড় শর্ত। সুরা বাকারার ২৪৭ নম্বর আয়াতে তালুতকে বাদশাহ হিসেবে মনোনীত করার বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেছেন যে, নেতৃত্বের জন্য বংশমর্যাদা বা আর্থিক সচ্ছলতার চেয়ে জ্ঞান এবং শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন সফল নেতাকে অবশ্যই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, দূরদর্শী এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অটল থাকার মতো মানসিক শক্তিসম্পন্ন হতে হবে।
ইসলামি দর্শনে নেতার মূল ভূমিকা হলো মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করা। সুরা আম্বিয়ার ৭৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন নেতৃত্বের কথা বলেছেন, যারা তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী মানুষকে পথ দেখান। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “জনগণের সেবকই প্রকৃত নেতা।” অর্থাৎ, একজন আদর্শ নেতা কখনো জনগণের ওপর প্রভুত্ব বা কর্তৃত্ব করবেন না, বরং জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করবেন। বিনয়, সত্যবাদিতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা হবে তাঁর চরিত্রের ভূষণ।
একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনে নেতার আরও কিছু বিশেষ গুণ থাকা বাঞ্ছনীয়:
১. ন্যায়বিচার (ইনসাফ): পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব বা স্বজনপ্রীতি ছাড়াই ইনসাফ কায়েম করা একজন নেতার প্রধান কাজ।
২. খোদাভীতি (তাকওয়া): যে নেতার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে, তিনি কখনো জুলুম বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে পারেন না। ইসলামে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া।
৩. পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত (শুরা): ইসলামে একনায়কতন্ত্রের কোনো স্থান নেই। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সুন্নাহ। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) নবুয়তের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের এই গুণাবলি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। ভোট একটি পবিত্র আমানত এবং এর সঠিক প্রয়োগের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। তাই কেবল আবেগ বা হুজুগে গা না ভাসিয়ে, কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত মানদণ্ডের আলোকে সৎ, যোগ্য এবং সেবার মানসিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব নির্বাচন করা প্রতিটি সচেতন মুসলিম ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কৃতকর্ম ও সিদ্ধান্তের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























