ঢাকা ০৭:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গুজব: সামাজিক বিপর্যয় ও ধর্মীয় সতর্কবার্তা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুজব ও অপপ্রচার এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। নিজ পছন্দের দল, ব্যক্তি বা প্রতীকের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে গিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপনের প্রবণতা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এর ফলে মানুষের জীবনহানি, সম্মানহানি থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে, যা এক গভীর সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

গুজব মূলত অসমর্থিত, অযাচাইকৃত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে ও সঠিক তথ্য প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ করে। এটি সামাজিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে সমাজে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

ইসলামে গুজব রটানো বা ছড়ানোকে একটি গুরুতর পাপ (কবিরা গুনাহ) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মিথ্যাচার, অপবাদ বা তোহমত-বুহতানকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, আর গুজব হলো এরই একটি মারাত্মক রূপ। অনুমান বা ধারণানির্ভর কোনো তথ্যের কোনো বাস্তব ভিত্তি না থাকায় গুজবে কান দেওয়া বা বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বা ঘটনা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা হুজরাতের ৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন, “হে মুমিনরা! যদি তোমাদের কাছে কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তখন তোমরা তা যাচাই-বাছাই করো (তথ্যানুসন্ধান ও সঠিক সূত্র সন্ধান করো), না হলে তোমরা (এ অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে) অজ্ঞতাবশত কারো প্রতি আক্রমণ করে বসবে (যা যথাযথ নয়), ফলে তোমরা পরে তোমাদের স্বীয় কর্মের জন্য লজ্জিত হবে।”

অন্যত্র সূরা বনি ইসরাইলের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “যে বিষয়ে তোমার সঠিক জ্ঞান নেই, তা অনুসরণ করো না; নিশ্চয় কান, চোখ, অন্তর-এসবের প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব বা জিজ্ঞাসা করা হবে।”

মহানবী (সা.) গুজব ও মিথ্যাচারের বিপদ সম্পর্কে বারবার সাবধান করেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা সংবাদ।” (বুখারি: ৬০৬৪)। আরেকটি হাদিসে তিনি আরও বলেছেন, “কোনো লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে (সত্যতা যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়।” (মুসলিম: ৫)। এছাড়া, সূরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “হে বিশ্বাসীরা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, অনুমান অনেক ক্ষেত্রেই পাপ।”

উপরোক্ত কোরআনের আয়াত ও হাদিসসমূহ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সঠিক তথ্য-উপাত্তবিহীন ধারণা এবং ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সমাজে গুজব সৃষ্টি করে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। তাই একজন সচেতন নাগরিক ও মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের গুজব সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক থাকা অপরিহার্য। নিজে গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা, গুজবে কান না দেওয়া এবং গুজবে প্রভাবিত না হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বরং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো উচিত। কারণ, প্রকৃত মুমিন ও মুসলিমের পরিচয় দিতে গিয়ে নবী (সা.) বলেছেন, “যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে, সে-ই প্রকৃত মুমিন।” (তিরমিজি: ২৬২৭)। এই শিক্ষা আমাদের সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় পথ দেখাবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্র উৎপাদন নেটওয়ার্কে যুক্তরাষ্ট্রের বড় নিষেধাজ্ঞা

গুজব: সামাজিক বিপর্যয় ও ধর্মীয় সতর্কবার্তা

আপডেট সময় : ০৯:৫৭:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুজব ও অপপ্রচার এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। নিজ পছন্দের দল, ব্যক্তি বা প্রতীকের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখাতে গিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপনের প্রবণতা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এর ফলে মানুষের জীবনহানি, সম্মানহানি থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে, যা এক গভীর সংকটের জন্ম দিচ্ছে।

গুজব মূলত অসমর্থিত, অযাচাইকৃত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে ও সঠিক তথ্য প্রাপ্তির পথ রুদ্ধ করে। এটি সামাজিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে সমাজে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

ইসলামে গুজব রটানো বা ছড়ানোকে একটি গুরুতর পাপ (কবিরা গুনাহ) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মিথ্যাচার, অপবাদ বা তোহমত-বুহতানকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, আর গুজব হলো এরই একটি মারাত্মক রূপ। অনুমান বা ধারণানির্ভর কোনো তথ্যের কোনো বাস্তব ভিত্তি না থাকায় গুজবে কান দেওয়া বা বিশ্বাস করা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বা ঘটনা প্রচার করা থেকে বিরত থাকার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা সূরা হুজরাতের ৬ নম্বর আয়াতে মুমিনদের সতর্ক করে বলেছেন, “হে মুমিনরা! যদি তোমাদের কাছে কোনো ফাসিক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তখন তোমরা তা যাচাই-বাছাই করো (তথ্যানুসন্ধান ও সঠিক সূত্র সন্ধান করো), না হলে তোমরা (এ অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে) অজ্ঞতাবশত কারো প্রতি আক্রমণ করে বসবে (যা যথাযথ নয়), ফলে তোমরা পরে তোমাদের স্বীয় কর্মের জন্য লজ্জিত হবে।”

অন্যত্র সূরা বনি ইসরাইলের ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “যে বিষয়ে তোমার সঠিক জ্ঞান নেই, তা অনুসরণ করো না; নিশ্চয় কান, চোখ, অন্তর-এসবের প্রতিটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব বা জিজ্ঞাসা করা হবে।”

মহানবী (সা.) গুজব ও মিথ্যাচারের বিপদ সম্পর্কে বারবার সাবধান করেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা সংবাদ।” (বুখারি: ৬০৬৪)। আরেকটি হাদিসে তিনি আরও বলেছেন, “কোনো লোকের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে (সত্যতা যাচাই না করে) তা-ই বলে বেড়ায়।” (মুসলিম: ৫)। এছাড়া, সূরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “হে বিশ্বাসীরা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, অনুমান অনেক ক্ষেত্রেই পাপ।”

উপরোক্ত কোরআনের আয়াত ও হাদিসসমূহ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সঠিক তথ্য-উপাত্তবিহীন ধারণা এবং ভুল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সমাজে গুজব সৃষ্টি করে এবং ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে। তাই একজন সচেতন নাগরিক ও মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের গুজব সম্পর্কে সজাগ ও সতর্ক থাকা অপরিহার্য। নিজে গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকা, গুজবে কান না দেওয়া এবং গুজবে প্রভাবিত না হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বরং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো উচিত। কারণ, প্রকৃত মুমিন ও মুসলিমের পরিচয় দিতে গিয়ে নবী (সা.) বলেছেন, “যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে, সে-ই প্রকৃত মুমিন।” (তিরমিজি: ২৬২৭)। এই শিক্ষা আমাদের সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় পথ দেখাবে।