যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেপরোয়া নীতি বিশ্বজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। শপথ নেওয়ার পরপরই একের পর এক নির্বাহী আদেশ জারি করে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করেন, তেমনি শুল্কযুদ্ধ থেকে শুরু করে সামরিক হস্তক্ষেপের মতো আগ্রাসী পদক্ষেপের মাধ্যমে বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোতে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তার এসব কার্যক্রমে পুরনো আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও জোটগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প শুরুতেই তার পূর্বসূরি জো বাইডেনের ৭৮টি নির্বাহী আদেশ বাতিল করেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং সীমান্ত নিরাপত্তা কঠোর করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আদেশে তিনি স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি তার প্রশাসনের ভিন্ন নীতি ও কর্মপন্থা পরিষ্কার করেন।
মার্কিন অর্থনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প শুরু করেন শুল্কযুদ্ধ। বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্কারোপের হুমকি দিয়ে তিনি এক ধরনের ভীতি ছড়িয়ে দেন। একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া সব পণ্যের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ এবং ৫৭টি দেশের আমদানির ওপর ১১ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চহারে শুল্কারোপ করা হয়। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের ঝড় ওঠে। যদিও পরে চীন ছাড়া অন্যান্য দেশের জন্য এই ঘোষণা সাময়িকভাবে স্থগিত করে সমঝোতার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে ভারতসহ অনেক দেশকেই ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর শুল্ক নীতির মুখে পড়তে হয়। এমনকি ইউরোপীয় মিত্রদেরও তিনি ছাড় দেননি, যা নতুন এক বৈশ্বিক বাণিজ্য বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়—যুক্তরাষ্ট্রকে চটালে চলবে না এবং রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করা যাবে না।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ অবসানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ‘থামিয়ে’ আলোচনায় আসেন এবং নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেন। ইসরায়েলের হয়ে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালান ট্রাম্প, যদিও তাতে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। তবে ইরানের সরকার পরিবর্তনের তার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার একপর্যায়ে বিবদমান পক্ষগুলোকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করান তিনি। যদিও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের দিক থেকে সংঘাতের সূচনা হয়েছিল এবং ইসরায়েল ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়। এই সংঘাতে ৭২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং অন্তত দুই লাখ আহত হয়েছিলেন।
গাজাকে পুনর্গঠনের জন্য ট্রাম্প একটি নতুন ক্লাব গঠন করেন, যার নাম দেন ‘বোর্ড অব পিস’। সুইজারল্যান্ডের দাভোস ইকোনমিক ফোরামে ১৯ দেশের প্রতিনিধি নিয়ে এই ক্লাবের ঘোষণা দেন তিনি। ‘নতুন গাজা’ কেমন হবে, তার একটি রূপরেখাও সেখানে তুলে ধরা হয়, যেখানে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলজুড়ে নতুন আবাসিক, কৃষি ও শিল্প এলাকা উন্নয়নের পরিকল্পনা দেখানো হয়। এই উদ্যোগকে অনেকে জাতিসংঘের কার্যকারিতা নষ্ট করার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক কাঠামো ভেঙে নিজস্ব প্রভাবাধীন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প নিজেই এই ক্লাবের চেয়ারম্যান।
নতুন বছর ২০২৬ সালেও ট্রাম্প তার পুরোনো ছন্দ ধরে রাখেন। জানুয়ারির শুরুতে তার ডেল্টা ফোর্স ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে কারাকাস থেকে নিউ ইয়র্কে তুলে নিয়ে আসে। মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ এনে আলোচনার জন্য বারবার হুমকি দেওয়া হলেও তিনি রাজি না হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির প্রতি ট্রাম্পের বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘উঠান নীতি’কেও স্পষ্ট করে তোলে, যেখানে আশপাশের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হতে বা পরিণতি ভোগ করতে হয়।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প ইরানকে নিশানা করেন। বাগ্যুদ্ধ পেরিয়ে গত বছরের মাঝামাঝিতে দেশটির পরমাণু স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালানো হয়। সম্প্রতি ইরানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বিক্ষোভ দেখা দিলে ট্রাম্প তাতে সরাসরি উসকানি দেন এবং ‘সাহায্য আসছে’ বলে মন্তব্য করেন। এমনকি ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার অবসানে সামরিক হামলার হুমকিও দেন তিনি, যদিও পরে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ঘোষণা দেন। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন এয়ারক্র্যাফ্ট ক্যারিয়ারের উপস্থিতি হামলার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না।
ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাব ইউরোপেও পৌঁছে যায়। তিনি ডেনমার্কের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখল বা অধিগ্রহণের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন, এমনকি সামরিক বলপ্রয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ট্রাম্পের দাবি, চীনের গ্রিনল্যান্ড চাওয়ার কারণে বিশ্বশান্তি ঝুঁকির মুখে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেন যে, গ্রিনল্যান্ডে হামলা হলে ন্যাটো জোটের সমাপ্তি ঘটবে। উত্তেজনার একপর্যায়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ গ্রিনল্যান্ড রক্ষায় সেনা পাঠালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় মিত্রদের সেনারা মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসে। ক্ষিপ্ত ট্রাম্প শাস্তিস্বরূপ ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
শুল্কারোপ, সামরিক অভিযান, হুমকি বা নিষেধাজ্ঞা—বিভিন্ন পন্থায় ট্রাম্প বিশ্বে নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাঝেমধ্যে প্রতিরোধের মুখে পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের জোরে তার মতই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকছে। বিপুল ক্ষমতা পেয়ে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছেন এবং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে ডেমোক্র্যাটদের মতো বিরোধী পক্ষও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারছে না, যা ট্রাম্পকে আরও একরোখা ও ভয়ংকর করে তুলছে। তার এসব কর্মকাণ্ড প্রাচীন বাদশাহদের আধিপত্যবাদী চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা নিজেদের রাজ্য নিয়ন্ত্রণে শক্তি প্রয়োগ করতেন, কিন্তু ট্রাম্প নিজের দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র বিশ্বকে তালুবন্দি করতে চাইছেন।
রিপোর্টারের নাম 

























