নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাম্প্রতিক বাছাই প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশনে কয়েক দিনের নাটকীয় শুনানি শেষে হাতেগোনা কয়েকজন বাদে প্রায় সব প্রভাবশালী প্রার্থীর মনোনয়নই বৈধতা পেয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারের দাবি কি তবে কেবল কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে?
নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে এক পর্যায়ে হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপি এক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ করার সময় কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ অনেকটা অসহায়ভাবে মন্তব্য করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ব্যাংকের টাকাটা যেন পরিশোধ করে দেওয়া হয়, নতুবা জনরোষ তৈরি হতে পারে। একজন নির্বাচন কমিশনারের এমন ব্যক্তিগত ও মানবিক আবেদন রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রশ্ন উঠেছে, যে ব্যক্তি বিরোধী দলে থেকেও হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি হয়েও পার পেয়ে যান, তিনি যদি আগামীতে সরকারের অংশ হন, তবে পাওনাদার প্রতিষ্ঠানগুলো তার কাছ থেকে টাকা আদায়ের সাহস পাবে কি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যমান আইনেই ঋণখেলাপি ও বিলখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ সুগম করে রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো শিল্পপতি তার প্রতিষ্ঠানের নামে শত শত কোটি টাকার বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিল বকেয়া রাখলেও ব্যক্তিগতভাবে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হন না। কারণ আইনের দৃষ্টিতে বকেয়ার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের, মালিকের নয়। এই আইনি ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ ব্যবহার করেই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করে আবার আইনপ্রণেতা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশন এই আইনি লুপহোল বা ফাঁকফোকরগুলো বন্ধে কার্যকর সংস্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এদিকে, দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তুঙ্গে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো দ্বৈত নাগরিক সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। তবে অনেক প্রার্থীই নির্বাচনের ঠিক আগে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণা দিয়ে মনোনয়ন জমা দেন। এই ঘোষণা পরবর্তী সময়ে কতটুকু কার্যকর হয় বা সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে তা অনুমোদিত হয় কি না, তা যাচাইয়ের কোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশনের নেই। বিগত সরকারের অনেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও দ্বৈত নাগরিকত্ব গোপন রেখে ক্ষমতা ভোগের অভিযোগ ছিল। বর্তমান নির্বাচনেও বড় বড় রাজনৈতিক দলের অনেক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ রয়েছে, যা হলফনামায় গোপন করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থার এই কলুষিত চিত্র পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভোটারদের সচেতনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় ঋণখেলাপি বা বিলখেলাপি ব্যক্তিরা নিজেদের ‘দানবীর’ হিসেবে জাহির করে ভোটারদের প্রভাবিত করছেন। ব্যাংকের টাকা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ করাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে সৎ ও তরুণ প্রার্থীরা অর্থের অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও আনাসদের মতো শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তার প্রতিফলন নির্বাচনী ব্যবস্থায় দৃশ্যমান হওয়া জরুরি। ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের মিথ্যা হলফনামা দিয়ে নির্বাচনে জেতার পথ বন্ধ করতে না পারলে সংসদের চারিত্রিক পরিবর্তন অসম্ভব। এই অবস্থায় জনগণের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, নির্বাচনের পরেও যেন প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য যাচাই করা হয় এবং কোনো অসত্য তথ্য পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা ও রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রতিহত করা হয়। জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধরে রাখতে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজকে এই প্রক্রিয়ায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে হবে।
রিপোর্টারের নাম 

























