ঢাকা ১২:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬

সিলেটে জুলাই বিপ্লবের হত্যা মামলার আসামির দাপটে অচল সাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১০:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নে প্রশাসনিক কার্যক্রম চরম স্থবির হয়ে পড়েছে। জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্র হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ও যুবলীগ ক্যাডার বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছার প্রভাবে ইউনিয়ন পরিষদটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জালিয়াতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং দাপ্তরিক অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা। কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আর ইউনিয়ন পরিষদে ফিরছেন না। বর্তমানে তিনি সিলেট নগরীর নিজস্ব বাসভবনে অবস্থান করে সেখান থেকেই পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন বিকেলে পরিষদের একজন কর্মচারী (দফাদার) গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে চেয়ারম্যানের শহরে অবস্থিত বাসায় যান। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৩ ধারা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। পরিষদের চেয়ারম্যানকে কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি তা উপেক্ষা করছেন। উপজেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিষদ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সেখানে একটি শক্তিশালী জালিয়াত চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ইউপি সদস্য আছারুন নেছা ও মো. স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে উত্তরাধিকার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা বর্তমানে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তদন্ত করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে ইউনিয়নে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা যুক্তরাজ্য ভ্রমণের অজুহাতে ছুটির আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী প্যানেল চেয়ারম্যান-১ বা ২-এর দায়িত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হওয়ায় চেয়ারম্যান কৌশলে প্যানেল চেয়ারম্যান-৩ আছারুন নেছাকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর প্রতিবাদে অন্য সদস্যরা নতুন প্যানেল গঠনের দাবি তোলেন। এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চেয়ারম্যান সশরীরে উপস্থিত না হয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘জুম’-এর মাধ্যমে বৈঠক ডাকেন। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন না পেয়ে তিনি ক্ষিপ্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জানুয়ারি একদল সন্ত্রাসী ইউনিয়ন পরিষদে হামলা চালায়। চেয়ারম্যানের আত্মীয় ও ছাত্রলীগ নেতা সজ্জাদ মিয়া এবং সুফি রাজিবের নেতৃত্বে একদল লোক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রেজুলেশন বহি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ইউপি সদস্য বখতিয়ার হোসেন বাধা দিলে তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে। এর পরদিন ২২ জানুয়ারি চেয়ারম্যান আবারও গোপনে পরিষদে এসে নথিপত্রে সই করানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু অধিকাংশ সদস্য তাতে সায় দেননি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

ইউপি সদস্য বখতিয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, চেয়ারম্যানের প্রভাবশালী স্বজনরা ইউনিয়ন পরিষদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন। এর আগেও একাধিকবার পরিষদে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমিত সিংহ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

লোহিত সাগরে ফ্রান্সের দুটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন: প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর ঘোষণা

সিলেটে জুলাই বিপ্লবের হত্যা মামলার আসামির দাপটে অচল সাদিপুর ইউনিয়ন পরিষদ

আপডেট সময় : ০৬:১০:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২৬

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নে প্রশাসনিক কার্যক্রম চরম স্থবির হয়ে পড়েছে। জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্র হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ও যুবলীগ ক্যাডার বর্তমান চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছার প্রভাবে ইউনিয়ন পরিষদটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জালিয়াতি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং দাপ্তরিক অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা। কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আর ইউনিয়ন পরিষদে ফিরছেন না। বর্তমানে তিনি সিলেট নগরীর নিজস্ব বাসভবনে অবস্থান করে সেখান থেকেই পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন বিকেলে পরিষদের একজন কর্মচারী (দফাদার) গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে চেয়ারম্যানের শহরে অবস্থিত বাসায় যান। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৩ ধারা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। পরিষদের চেয়ারম্যানকে কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি তা উপেক্ষা করছেন। উপজেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিষদ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে সেখানে একটি শক্তিশালী জালিয়াত চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ইউপি সদস্য আছারুন নেছা ও মো. স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে উত্তরাধিকার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা বর্তমানে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) তদন্ত করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে ইউনিয়নে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে এবং আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছা যুক্তরাজ্য ভ্রমণের অজুহাতে ছুটির আবেদন করেন। নিয়ম অনুযায়ী প্যানেল চেয়ারম্যান-১ বা ২-এর দায়িত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হওয়ায় চেয়ারম্যান কৌশলে প্যানেল চেয়ারম্যান-৩ আছারুন নেছাকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর প্রতিবাদে অন্য সদস্যরা নতুন প্যানেল গঠনের দাবি তোলেন। এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য চেয়ারম্যান সশরীরে উপস্থিত না হয়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘জুম’-এর মাধ্যমে বৈঠক ডাকেন। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন না পেয়ে তিনি ক্ষিপ্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জানুয়ারি একদল সন্ত্রাসী ইউনিয়ন পরিষদে হামলা চালায়। চেয়ারম্যানের আত্মীয় ও ছাত্রলীগ নেতা সজ্জাদ মিয়া এবং সুফি রাজিবের নেতৃত্বে একদল লোক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রেজুলেশন বহি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ইউপি সদস্য বখতিয়ার হোসেন বাধা দিলে তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরুদ্ধ কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে। এর পরদিন ২২ জানুয়ারি চেয়ারম্যান আবারও গোপনে পরিষদে এসে নথিপত্রে সই করানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু অধিকাংশ সদস্য তাতে সায় দেননি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত দেখে তিনি দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।

ইউপি সদস্য বখতিয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন, চেয়ারম্যানের প্রভাবশালী স্বজনরা ইউনিয়ন পরিষদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছেন। এর আগেও একাধিকবার পরিষদে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমিত সিংহ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান সাহেদ আহমদ মুছার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।