ঢাকা ০৫:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষায় অধ্যাদেশ জারি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:১৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই অধ্যাদেশে সই করার পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করেছে।

অধ্যাদেশটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার এই সর্বাত্মক আন্দোলন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে স্বীকৃত। এই আন্দোলন চলাকালে ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত সশস্ত্র আক্রমণ ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের লক্ষ্যে আত্মরক্ষাসহ জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তাতে অংশগ্রহণকারীদের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুরক্ষা প্রদান করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশটি জারি করেছেন।

মামলা প্রত্যাহার ও আইনি বিধিনিষেধ

এই অধ্যাদেশের অন্যতম প্রধান দিক হলো গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত আন্দোলনের কারণে যে সব মামলা বা অভিযোগ দায়ের হয়েছে, তা সরকার কর্তৃক প্রত্যয়ন সাপেক্ষে আদালত থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সরাসরি অব্যাহতি বা খালাসপ্রাপ্ত হবেন। এছাড়া, আন্দোলনের সময়কার কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন মামলা দায়ের করা আইনত নিষিদ্ধ বা বারিত করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগ ও তদন্ত প্রক্রিয়া

যদি কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা সরাসরি আদালতে না গিয়ে বিশেষ তদন্ত কমিশনে দাখিল করতে হবে। ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী গঠিত এই কমিশন অভিযোগটি তদন্ত করবে। তবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে একটি বিশেষ শর্ত রাখা হয়েছে; যদি হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হন, তবে সেই বাহিনীর কোনো বর্তমান বা প্রাক্তন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। তদন্ত চলাকালে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে কমিশনের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অপরাধমূলক অপব্যবহার বনাম রাজনৈতিক প্রতিরোধ

কমিশনের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে, কোনো কর্মকাণ্ড স্রেফ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ‘অপরাধমূলক অপব্যবহার’ ছিল, তবে কমিশন সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। আদালত সেই প্রতিবেদনকে নিয়মিত পুলিশ রিপোর্ট হিসেবে গণ্য করে বিচার শুরু করবে। কিন্তু যদি তদন্তে দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডটি ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ’ ছিল, তবে সেই বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা করা যাবে না। সেক্ষেত্রে কমিশন চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে।

এই অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং এটি ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্বপ্রভাবী (Retrospective effect) হিসেবে বলবৎ হয়েছে বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষা এবং বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের হয়রানি থেকে মুক্তির আইনি ভিত্তি স্থাপিত হলো।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের সুরক্ষায় অধ্যাদেশ জারি

আপডেট সময় : ০২:১৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই অধ্যাদেশে সই করার পর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করেছে।

অধ্যাদেশটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার এই সর্বাত্মক আন্দোলন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে স্বীকৃত। এই আন্দোলন চলাকালে ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্দেশে পরিচালিত সশস্ত্র আক্রমণ ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধের লক্ষ্যে আত্মরক্ষাসহ জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তাতে অংশগ্রহণকারীদের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুরক্ষা প্রদান করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি এই অধ্যাদেশটি জারি করেছেন।

মামলা প্রত্যাহার ও আইনি বিধিনিষেধ

এই অধ্যাদেশের অন্যতম প্রধান দিক হলো গণঅভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত আন্দোলনের কারণে যে সব মামলা বা অভিযোগ দায়ের হয়েছে, তা সরকার কর্তৃক প্রত্যয়ন সাপেক্ষে আদালত থেকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সরাসরি অব্যাহতি বা খালাসপ্রাপ্ত হবেন। এছাড়া, আন্দোলনের সময়কার কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন মামলা দায়ের করা আইনত নিষিদ্ধ বা বারিত করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগ ও তদন্ত প্রক্রিয়া

যদি কোনো গণঅভ্যুত্থানকারীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা সরাসরি আদালতে না গিয়ে বিশেষ তদন্ত কমিশনে দাখিল করতে হবে। ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী গঠিত এই কমিশন অভিযোগটি তদন্ত করবে। তবে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে একটি বিশেষ শর্ত রাখা হয়েছে; যদি হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হন, তবে সেই বাহিনীর কোনো বর্তমান বা প্রাক্তন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। তদন্ত চলাকালে কাউকে গ্রেপ্তার করতে হলে কমিশনের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

অপরাধমূলক অপব্যবহার বনাম রাজনৈতিক প্রতিরোধ

কমিশনের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় যে, কোনো কর্মকাণ্ড স্রেফ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ‘অপরাধমূলক অপব্যবহার’ ছিল, তবে কমিশন সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। আদালত সেই প্রতিবেদনকে নিয়মিত পুলিশ রিপোর্ট হিসেবে গণ্য করে বিচার শুরু করবে। কিন্তু যদি তদন্তে দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডটি ‘রাজনৈতিক প্রতিরোধের অংশ’ ছিল, তবে সেই বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা করা যাবে না। সেক্ষেত্রে কমিশন চাইলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারকে আদেশ দিতে পারবে।

এই অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং এটি ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্বপ্রভাবী (Retrospective effect) হিসেবে বলবৎ হয়েছে বলে গণ্য হবে। এর মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট রক্ষা এবং বিপ্লবে অংশগ্রহণকারীদের হয়রানি থেকে মুক্তির আইনি ভিত্তি স্থাপিত হলো।