ঢাকা ০৫:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোটারদের হাতে নতুন বাংলাদেশের ভাগ্য; ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:০৫:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১২ বার পড়া হয়েছে

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত রচিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বহুপ্রতীক্ষিত গণভোট। এই গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর সাংবিধানিক কাঠামো। ব্যালট পেপারে ভোটারদের জন্য সুনির্দিষ্ট চারটি বিষয় উল্লেখ থাকবে, যার ওপর ভিত্তি করে তাঁরা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী তথা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই সনদ বাস্তবায়ন হলে দেশ শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে এবং সংস্কারের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। উল্লেখ্য, এই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

১. ভাষা, জাতি ও মৌলিক সংস্কার

বর্তমান সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ মূলনীতি হলেও জুলাই সনদ অনুযায়ী নতুন মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি। * পরিচয়: নাগরিকদের জাতিগত পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘বাংলাদেশি’ হবে।

  • ভাষা: বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
  • মৌলিক অধিকার: সংবিধানে নতুন করে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত করা হবে।

২. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী: ক্ষমতার ভারসাম্য

ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ রোধে জুলাই সনদে বৈপ্লবিক কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে:

  • মেয়াদ সীমা: এক ব্যক্তি এক জীবনে দুই মেয়াদের (১০ বছর) বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
  • জরুরি অবস্থা: প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে নয়, বরং মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতিতে জরুরি অবস্থা জারির বিধান রাখা হয়েছে।
  • নিয়োগ ক্ষমতা: মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
  • নির্বাচন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন গোপন ব্যালটে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে।

৩. সংসদ, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা

প্রস্তাবিত সনদে বাংলাদেশের এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) করার কথা বলা হয়েছে।

  • উচ্চকক্ষ: ১০০ সদস্য বিশিষ্ট এই কক্ষের আসন বণ্টন হবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে।
  • নারীদের আসন: সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংবিধানে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
  • দলীয় আনুগত্য: বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন (৭০ অনুচ্ছেদের শিথিলকরণ)।

৪. আইন ও বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে জুলাই সনদে বেশ কিছু কঠোর প্রস্তাব আনা হয়েছে:

  • বিচারক নিয়োগ: হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে দেওয়া হবে।
  • ন্যায়পাল: প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণসহ একটি শক্তিশালী কমিটি ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ দেবে।
  • নতুন বিভাগ: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দুটি বিভাগ গঠন করার নির্বাহী আদেশও এই সনদের অংশ।

ভোটারদের জন্য সতর্কবার্তা: ১২ই ফেব্রুয়ারির ব্যালট পেপারে এই বিস্তারিত ৮৪টি ধারা লেখা থাকবে না। সেখানে কেবল চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্ট থাকবে। যদি ‘হ্যাঁ’ জয় পায়, তবে আগামী সংসদ এই ৮৪টি ধারা ৯ মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে। আর যদি ‘না’ জয় পায়, তবে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না এবং আগের সংবিধানই বহাল থাকবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

ভোটারদের হাতে নতুন বাংলাদেশের ভাগ্য; ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট

আপডেট সময় : ০২:০৫:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত রচিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বহুপ্রতীক্ষিত গণভোট। এই গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর সাংবিধানিক কাঠামো। ব্যালট পেপারে ভোটারদের জন্য সুনির্দিষ্ট চারটি বিষয় উল্লেখ থাকবে, যার ওপর ভিত্তি করে তাঁরা ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী তথা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় দেশবাসীকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই সনদ বাস্তবায়ন হলে দেশ শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে এবং সংস্কারের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। উল্লেখ্য, এই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

১. ভাষা, জাতি ও মৌলিক সংস্কার

বর্তমান সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ মূলনীতি হলেও জুলাই সনদ অনুযায়ী নতুন মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি। * পরিচয়: নাগরিকদের জাতিগত পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘বাংলাদেশি’ হবে।

  • ভাষা: বাংলার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
  • মৌলিক অধিকার: সংবিধানে নতুন করে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত করা হবে।

২. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী: ক্ষমতার ভারসাম্য

ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ রোধে জুলাই সনদে বৈপ্লবিক কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে:

  • মেয়াদ সীমা: এক ব্যক্তি এক জীবনে দুই মেয়াদের (১০ বছর) বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
  • জরুরি অবস্থা: প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে নয়, বরং মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতিতে জরুরি অবস্থা জারির বিধান রাখা হয়েছে।
  • নিয়োগ ক্ষমতা: মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।
  • নির্বাচন: রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন গোপন ব্যালটে সংসদের উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে।

৩. সংসদ, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা

প্রস্তাবিত সনদে বাংলাদেশের এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ) করার কথা বলা হয়েছে।

  • উচ্চকক্ষ: ১০০ সদস্য বিশিষ্ট এই কক্ষের আসন বণ্টন হবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে।
  • নারীদের আসন: সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার: সংবিধানে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
  • দলীয় আনুগত্য: বাজেট ও আস্থাবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যরা নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন (৭০ অনুচ্ছেদের শিথিলকরণ)।

৪. আইন ও বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন

বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে জুলাই সনদে বেশ কিছু কঠোর প্রস্তাব আনা হয়েছে:

  • বিচারক নিয়োগ: হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরিয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে দেওয়া হবে।
  • ন্যায়পাল: প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণসহ একটি শক্তিশালী কমিটি ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ দেবে।
  • নতুন বিভাগ: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে নতুন দুটি বিভাগ গঠন করার নির্বাহী আদেশও এই সনদের অংশ।

ভোটারদের জন্য সতর্কবার্তা: ১২ই ফেব্রুয়ারির ব্যালট পেপারে এই বিস্তারিত ৮৪টি ধারা লেখা থাকবে না। সেখানে কেবল চারটি সংক্ষিপ্ত পয়েন্ট থাকবে। যদি ‘হ্যাঁ’ জয় পায়, তবে আগামী সংসদ এই ৮৪টি ধারা ৯ মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবে। আর যদি ‘না’ জয় পায়, তবে জুলাই সনদ কার্যকর হবে না এবং আগের সংবিধানই বহাল থাকবে।