ঢাকা ০৫:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভোট কেনাবেচা রোধে সীমা কমানোর সুপারিশ গোয়েন্দাদের; ‘ভিত্তিহীন’ বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস (MFS) ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় সুপারিশ করেছে যে, নির্বাচনি প্রচারণার শুরুর দিন (২২ জানুয়ারি) থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এমএফএস লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হোক। তবে এই সুপারিশকে পুরোপুরি ‘অমূলক ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করে তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল উদ্বেগ: গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রার্থীরা সরাসরি নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি এড়াতে এমএফএস-এর মাধ্যমে টার্গেটেড ভোটারদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে পারে। বিশেষ করে এজেন্ট অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেনের কোনো নির্দিষ্ট সীমা না থাকায় সেগুলোকে অবৈধ অর্থ বিতরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের বিশেষ ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, লেনদেনের সীমা না কমালে নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নষ্ট হতে পারে এবং জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পাল্টা যুক্তি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সুপারিশকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, কেবল এমএফএস লেনদেনের সীমা কমিয়ে ভোট কেনাবেচা বন্ধ করা সম্ভব নয়। যদি এমএফএস বন্ধ করা হয়, তবে কার্ড টু কার্ড ট্রান্সফার বা ইন্টারনেটের অন্যান্য মাধ্যমে লেনদেন হতে পারে। এতে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তির শিকার হবেন, কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা বিকল্প পথ খুঁজে নেবে। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমএফএস লেনদেনের সীমা বাড়িয়ে দৈনিক ক্যাশ-ইন ৫০ হাজার এবং মাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছিল।

গোয়েন্দা সংস্থার উল্লেখযোগ্য ৯টি সুপারিশ: ১. সন্দেহজনক ও বড় অঙ্কের অস্বাভাবিক লেনদেন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। ২. বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ টিম গঠন করা। ৩. নির্বাচনি এলাকায় মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা। ৪. সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলো দ্রুততম সময়ে ফ্রিজ বা স্থগিত করা। ৫. প্রচার শুরুর দিন থেকে লেনদেনের সীমা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। ৬. এমএফএস এজেন্টদের দৈনন্দিন হিসাবের খাতা স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ অফিসে পাঠানো। ৭. এমএফএস-এর মাধ্যমে ভোট কেনাবেচায় জড়িতদের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিচার করা। ৮. মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট চেকলিস্ট বাস্তবায়ন করা। ৯. অবৈধ লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের জন্য সার্বক্ষণিক অভিযোগ সেল গঠন করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, লেনদেনের সীমা কমানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা যথা সময়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো হবে। আপাতত বর্তমান লেনদেনের সীমা বহাল থাকছে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

ভোট কেনাবেচা রোধে সীমা কমানোর সুপারিশ গোয়েন্দাদের; ‘ভিত্তিহীন’ বলছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আপডেট সময় : ০২:০২:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস (MFS) ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার আশঙ্কা করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় সুপারিশ করেছে যে, নির্বাচনি প্রচারণার শুরুর দিন (২২ জানুয়ারি) থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এমএফএস লেনদেনের ঊর্ধ্বসীমা বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হোক। তবে এই সুপারিশকে পুরোপুরি ‘অমূলক ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করে তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল উদ্বেগ: গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রার্থীরা সরাসরি নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি এড়াতে এমএফএস-এর মাধ্যমে টার্গেটেড ভোটারদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে পারে। বিশেষ করে এজেন্ট অ্যাকাউন্টগুলোতে লেনদেনের কোনো নির্দিষ্ট সীমা না থাকায় সেগুলোকে অবৈধ অর্থ বিতরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের বিশেষ ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, লেনদেনের সীমা না কমালে নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমান সুযোগ নষ্ট হতে পারে এবং জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পাল্টা যুক্তি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সুপারিশকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, কেবল এমএফএস লেনদেনের সীমা কমিয়ে ভোট কেনাবেচা বন্ধ করা সম্ভব নয়। যদি এমএফএস বন্ধ করা হয়, তবে কার্ড টু কার্ড ট্রান্সফার বা ইন্টারনেটের অন্যান্য মাধ্যমে লেনদেন হতে পারে। এতে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তির শিকার হবেন, কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা বিকল্প পথ খুঁজে নেবে। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এমএফএস লেনদেনের সীমা বাড়িয়ে দৈনিক ক্যাশ-ইন ৫০ হাজার এবং মাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছিল।

গোয়েন্দা সংস্থার উল্লেখযোগ্য ৯টি সুপারিশ: ১. সন্দেহজনক ও বড় অঙ্কের অস্বাভাবিক লেনদেন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা। ২. বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ টিম গঠন করা। ৩. নির্বাচনি এলাকায় মোবাইল কোর্টের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা। ৪. সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলো দ্রুততম সময়ে ফ্রিজ বা স্থগিত করা। ৫. প্রচার শুরুর দিন থেকে লেনদেনের সীমা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। ৬. এমএফএস এজেন্টদের দৈনন্দিন হিসাবের খাতা স্থানীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ অফিসে পাঠানো। ৭. এমএফএস-এর মাধ্যমে ভোট কেনাবেচায় জড়িতদের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিচার করা। ৮. মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট চেকলিস্ট বাস্তবায়ন করা। ৯. অবৈধ লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণের জন্য সার্বক্ষণিক অভিযোগ সেল গঠন করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, লেনদেনের সীমা কমানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা যথা সময়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো হবে। আপাতত বর্তমান লেনদেনের সীমা বহাল থাকছে বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।