ঢাকা ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই সংঘাত ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪১:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার পর মাত্র তিন দিনেই সারা দেশে অন্তত ৫২টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে প্রায় তিন শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পাশাপাশি, প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার প্রবণতাও অত্যন্ত কম দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সারা দেশে অন্তত ৪৫ জন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর প্রচার শুরুর আগেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তখনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ছিল ব্যাপক। নির্বাচন কমিশনের কিছুটা নমনীয়তার সুযোগে অনেক রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগ মূলত নামমাত্র জরিমানা ও শোকজ নোটিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তফসিল ঘোষণার পরও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। নির্বাচন কমিশন যেন গতানুগতিকভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে চাইছে, যা সংঘর্ষ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাকে নিয়মিত করে তুলেছে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, গত বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে নির্বাচন কমিশন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে শোকজ ও জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কমিশনের এই শিথিলতার সুযোগে প্রার্থীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, যা কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, “আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে সক্রিয় আছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং ফেমার সভাপতি মুনিরা খান বলেছেন, “কমিশন চাইলে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু কেন নিতে পারছে না, বা তাদের দুর্বলতা কোথায়, তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। শুধু শোকজ নোটিস ও জরিমানার মধ্যে শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকাটা দুঃখজনক। এখনো সময় আছে, এখনই আইন মেনে নির্বাচন কমিশনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

বিভিন্ন আসনে বিচ্ছিন্ন ঘটনা:

শেরপুর-১ আসনে তিন প্রার্থীকে শোকজ: আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রঙিন পোস্টার লাগানো এবং অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারের অভিযোগে শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. সানসিলা জেব্রিন প্রিয়াঙ্কা, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদকে শোকজ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, “মৃদু সমস্যা তৈরি হয়েছিল, আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে কোনো ধরনের সংঘর্ষ যেন না হয়, সেজন্য আমরা তাদের অনুরোধ করছি। বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে।”

ময়মনসিংহে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে হত্যা: ভোটের প্রচারণার শুরুতেই গত ২২ জানুয়ারি ময়মনসিংহে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৮ জন বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, “প্রচারণার শুরুতে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপর হামলা হয়েছিল। আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দলীয় কোন্দল: ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ভোটকেন্দ্র পাহারার ডাক দিয়েছেন। তার প্রচারণা কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে তিনি নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন যে তার কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন। গণমাধ্যমের কাছে তিনি অভিযোগ করেন যে, “আর একটি রাতের ভোট আয়োজনের চেষ্টা করলে এর ফল ভালো হবে না।” তিনি আরও জানান যে, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি নির্বাচনী মাঠ ছাড়বেন না।

সিলেটে গাড়ি ভাঙচুর: গত ২৪ জানুয়ারি রাতে সিলেটের জিন্দাবাজারে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীর একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। সিলেটের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোঃ সারওয়ার আলম এ প্রসঙ্গে জানান, “ঘটনাটি আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কিশোরগঞ্জে সংঘর্ষ: কিশোরগঞ্জে বিএনপির একটি জনসভাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। এতে অন্তত কয়েকজন আহত হয়েছেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিত্র: নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরগুলোতে প্লাস্টিক লেমিনেটেড রঙিন পোস্টার ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, দুপুর ২টার আগে এবং রাত ৮টার পর উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু কিছু জায়গায় মোটর শোভাযাত্রা ও ট্রাক মিছিলের মাধ্যমে শক্তির মহড়া দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন।

নির্বাচন কমিশনাররা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি আসনে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করছেন। যেকোনো বড় ধরনের গোলযোগ এড়াতে পুলিশ ও আনসার বাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রাখা হয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীর বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানা, তাৎক্ষণিক দণ্ড, এবং প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট বিধি লঙ্ঘন করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। রাজনৈতিক দল বিধি লঙ্ঘন করলে অনধিক দশ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর বা বারবার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা সরাসরি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাপট বেশি। প্রচার শুরুর আগে অন্তত অর্ধশত স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও প্রতিপক্ষের ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ জমা পড়েছিল। এছাড়াও, এনসিপি ও অন্যান্য ছোট দলের প্রায় ৪৫ জন প্রার্থী বিধিভঙ্গের তালিকায় ছিলেন। বিএনপির প্রায় ৮৫ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে জনসভা ও মিছিলে অতিরিক্ত লোকসমাগম এবং প্রচারে নিষিদ্ধ রঙিন পোস্টার ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রায় ৬০ জন প্রার্থীকে নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক ব্যবহার ও তোরণ নির্মাণের দায়ে শোকজ করা হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের ৩০০ আসনে সব প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্তভাবে প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৯৮১ জনে। তবে, এবার নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৬৭টি নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় ৫৯টি মামলায় মোট ৪ লক্ষ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় কারাদণ্ডের আদেশও দেওয়া হয়েছে। এই পর্যায়ে আচরণবিধি ভঙ্গের সংখ্যা ছিল ৭৭টি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খেলার সূচি: আজ টিভিতে যেসব ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ দেখা যাবে

নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই সংঘাত ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব

আপডেট সময় : ০৮:৪১:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার পর মাত্র তিন দিনেই সারা দেশে অন্তত ৫২টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে প্রায় তিন শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। পাশাপাশি, প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার প্রবণতাও অত্যন্ত কম দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই সারা দেশে অন্তত ৪৫ জন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে।

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর প্রচার শুরুর আগেও একই চিত্র লক্ষ্য করা গিয়েছিল। তখনো আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ছিল ব্যাপক। নির্বাচন কমিশনের কিছুটা নমনীয়তার সুযোগে অনেক রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা প্রয়োগ মূলত নামমাত্র জরিমানা ও শোকজ নোটিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তফসিল ঘোষণার পরও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। নির্বাচন কমিশন যেন গতানুগতিকভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে চাইছে, যা সংঘর্ষ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাকে নিয়মিত করে তুলেছে।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, গত বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে নির্বাচন কমিশন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে শোকজ ও জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কমিশনের এই শিথিলতার সুযোগে প্রার্থীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন, যা কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, “আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠে সক্রিয় আছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং ফেমার সভাপতি মুনিরা খান বলেছেন, “কমিশন চাইলে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু কেন নিতে পারছে না, বা তাদের দুর্বলতা কোথায়, তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। শুধু শোকজ নোটিস ও জরিমানার মধ্যে শাস্তি সীমাবদ্ধ থাকাটা দুঃখজনক। এখনো সময় আছে, এখনই আইন মেনে নির্বাচন কমিশনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

বিভিন্ন আসনে বিচ্ছিন্ন ঘটনা:

শেরপুর-১ আসনে তিন প্রার্থীকে শোকজ: আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রঙিন পোস্টার লাগানো এবং অতিরিক্ত মাইক ব্যবহারের অভিযোগে শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ডা. সানসিলা জেব্রিন প্রিয়াঙ্কা, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী রাশেদুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদকে শোকজ করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা তরফদার মাহমুদুর রহমান জানান, “মৃদু সমস্যা তৈরি হয়েছিল, আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে কোনো ধরনের সংঘর্ষ যেন না হয়, সেজন্য আমরা তাদের অনুরোধ করছি। বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ছাড়া নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে।”

ময়মনসিংহে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে হত্যা: ভোটের প্রচারণার শুরুতেই গত ২২ জানুয়ারি ময়মনসিংহে বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থককে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩৮ জন বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুর রহমান জানান, “প্রচারণার শুরুতে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপর হামলা হয়েছিল। আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দলীয় কোন্দল: ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ভোটকেন্দ্র পাহারার ডাক দিয়েছেন। তার প্রচারণা কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে তিনি নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন যে তার কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হচ্ছেন। গণমাধ্যমের কাছে তিনি অভিযোগ করেন যে, “আর একটি রাতের ভোট আয়োজনের চেষ্টা করলে এর ফল ভালো হবে না।” তিনি আরও জানান যে, কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি নির্বাচনী মাঠ ছাড়বেন না।

সিলেটে গাড়ি ভাঙচুর: গত ২৪ জানুয়ারি রাতে সিলেটের জিন্দাবাজারে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীর একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। সিলেটের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোঃ সারওয়ার আলম এ প্রসঙ্গে জানান, “ঘটনাটি আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কিশোরগঞ্জে সংঘর্ষ: কিশোরগঞ্জে বিএনপির একটি জনসভাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেছে। এতে অন্তত কয়েকজন আহত হয়েছেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের চিত্র: নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরগুলোতে প্লাস্টিক লেমিনেটেড রঙিন পোস্টার ব্যবহারের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া, দুপুর ২টার আগে এবং রাত ৮টার পর উচ্চ শব্দে মাইক বাজিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু কিছু জায়গায় মোটর শোভাযাত্রা ও ট্রাক মিছিলের মাধ্যমে শক্তির মহড়া দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনী আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন।

নির্বাচন কমিশনাররা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি আসনে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কাজ করছেন। যেকোনো বড় ধরনের গোলযোগ এড়াতে পুলিশ ও আনসার বাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন রাখা হয়েছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে প্রার্থীর বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানা, তাৎক্ষণিক দণ্ড, এবং প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট বিধি লঙ্ঘন করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক এক লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। রাজনৈতিক দল বিধি লঙ্ঘন করলে অনধিক দশ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর বা বারবার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা সরাসরি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাপট বেশি। প্রচার শুরুর আগে অন্তত অর্ধশত স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিরুদ্ধে পেশিশক্তি প্রদর্শন ও প্রতিপক্ষের ক্যাম্প ভাঙচুরের অভিযোগ জমা পড়েছিল। এছাড়াও, এনসিপি ও অন্যান্য ছোট দলের প্রায় ৪৫ জন প্রার্থী বিধিভঙ্গের তালিকায় ছিলেন। বিএনপির প্রায় ৮৫ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে জনসভা ও মিছিলে অতিরিক্ত লোকসমাগম এবং প্রচারে নিষিদ্ধ রঙিন পোস্টার ব্যবহারের অভিযোগ ছিল। জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রায় ৬০ জন প্রার্থীকে নির্ধারিত সময়ের আগে মাইক ব্যবহার ও তোরণ নির্মাণের দায়ে শোকজ করা হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের ৩০০ আসনে সব প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্তভাবে প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,৯৮১ জনে। তবে, এবার নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে অভিযান চালানো হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ৬৭টি নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় ৫৯টি মামলায় মোট ৪ লক্ষ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় কারাদণ্ডের আদেশও দেওয়া হয়েছে। এই পর্যায়ে আচরণবিধি ভঙ্গের সংখ্যা ছিল ৭৭টি।