ঢাকা ০৮:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬

কারওয়ান বাজারের আধিপত্য: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দিলীপের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত

রাজধানীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জের ধরেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা বলছেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সন্ত্রাসী বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে।

গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে দ্বন্দ্ব চলছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মুসাব্বিরকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গোয়েন্দা প্রধানের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় জিন্নাত ও রহিম নামের দুজন ভাড়াটে খুনি। এদের মধ্যে জিন্নাতকে পূর্বেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং সর্বশেষ গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) নরসিংদীর মাধবদী থানা এলাকা থেকে রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা উভয়েই স্বীকার করেছে যে, অর্থের বিনিময়ে তারা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল। গ্রেপ্তারকৃত রহিমের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় রহিমের বিরুদ্ধে মাধবদী থানায় অস্ত্র আইনে একটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল ইসলাম আরও জানান, ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অস্ত্র হাতে জিন্নাত ও রহিম ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। এই ফুটেজসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্রটি স্পষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ৮.৩০টায় রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী পাড়ার হোটেল সুপার স্টারের গলিতে মো. আজিজুর রহমান মুসাব্বির গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। এই মামলার এজাহারে উল্লিখিত অজ্ঞাত আসামিদের মধ্যে চারজনকে ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সর্বশেষ রহিম গ্রেপ্তার হওয়ায় এই মামলায় মোট পাঁচজন আসামিকে আটক করা হলো। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে ভাড়াটে খুনি জিন্নাত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।

বিদেশে বসে ‘দাদার’ হুকুম:

হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের নাম উঠে এসেছে। ডিবি প্রধান জানান, বিনাশ দাদা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তার ইশারায় ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হয়। গ্রেপ্তারকৃত জিন্নাত আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে যে, ‘দাদার’ নির্দেশেই এই খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খুনিদের আসকারা দিতে ‘দাদা আছে, সব দেখে নেবে’—এমন আশ্বাস দেওয়া হতো। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই। চাঁদাবাজির স্বার্থে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার করে।’

এদিকে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমনে ডিবির অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ডিবি ওয়ারী বিভাগের একটি দল গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, সাত রাউন্ড গুলি এবং একটি মোটরসাইকেলসহ মো. রানা মোল্লা (২৬) ও নূর মোহাম্মদ (৩২) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে ডিবির এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ডিবি জানিয়েছে, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূলে তাদের এই ধরনের কার্যক্রম নিরন্তর চলতে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

খেলার সূচি: আজ টিভিতে যেসব ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ দেখা যাবে

কারওয়ান বাজারের আধিপত্য: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দিলীপের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত

আপডেট সময় : ০৪:৪৭:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

রাজধানীর অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র কারওয়ান বাজারে আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জের ধরেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা বলছেন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কুখ্যাত সন্ত্রাসী বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে।

গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে দ্বন্দ্ব চলছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মুসাব্বিরকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গোয়েন্দা প্রধানের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় জিন্নাত ও রহিম নামের দুজন ভাড়াটে খুনি। এদের মধ্যে জিন্নাতকে পূর্বেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং সর্বশেষ গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) নরসিংদীর মাধবদী থানা এলাকা থেকে রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা উভয়েই স্বীকার করেছে যে, অর্থের বিনিময়ে তারা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল। গ্রেপ্তারকৃত রহিমের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন এবং ১২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। এই ঘটনায় রহিমের বিরুদ্ধে মাধবদী থানায় অস্ত্র আইনে একটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল ইসলাম আরও জানান, ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অস্ত্র হাতে জিন্নাত ও রহিম ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। এই ফুটেজসহ অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্রটি স্পষ্ট করতে সক্ষম হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি রাত আনুমানিক ৮.৩০টায় রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী পাড়ার হোটেল সুপার স্টারের গলিতে মো. আজিজুর রহমান মুসাব্বির গুলিবিদ্ধ হন। পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। এই মামলার এজাহারে উল্লিখিত অজ্ঞাত আসামিদের মধ্যে চারজনকে ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সর্বশেষ রহিম গ্রেপ্তার হওয়ায় এই মামলায় মোট পাঁচজন আসামিকে আটক করা হলো। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে ভাড়াটে খুনি জিন্নাত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।

বিদেশে বসে ‘দাদার’ হুকুম:

হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন বিনাশ দাদা ওরফে দিলীপের নাম উঠে এসেছে। ডিবি প্রধান জানান, বিনাশ দাদা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তার ইশারায় ঢাকার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হয়। গ্রেপ্তারকৃত জিন্নাত আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে যে, ‘দাদার’ নির্দেশেই এই খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খুনিদের আসকারা দিতে ‘দাদা আছে, সব দেখে নেবে’—এমন আশ্বাস দেওয়া হতো। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই। চাঁদাবাজির স্বার্থে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার করে।’

এদিকে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাস দমনে ডিবির অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ডিবি ওয়ারী বিভাগের একটি দল গত শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, সাত রাউন্ড গুলি এবং একটি মোটরসাইকেলসহ মো. রানা মোল্লা (২৬) ও নূর মোহাম্মদ (৩২) নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে ডিবির এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে। ডিবি জানিয়েছে, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস নির্মূলে তাদের এই ধরনের কার্যক্রম নিরন্তর চলতে থাকবে।