ঢাকা ০৭:২২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রমজানের আগমনী বার্তা: প্রস্তুতি ও ইবাদতের মাস পবিত্র শাবান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৭:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

আরবি হিজরি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস পবিত্র শাবান, যা মুসলিম উম্মাহর কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। মহিমান্বিত রমজানের পরিপূর্ণ বরকত লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার এক বিশেষ সময় এই শাবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসটিকে ইবাদতের ‘প্রশিক্ষণকাল’ হিসেবে গণ্য করতেন, যা মুমিনদের আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অনন্য সুযোগ করে দেয়।

মূল আরবী শব্দ ‘শাবান’-এর আভিধানিক অর্থ হলো শাখা-প্রশাখা বা বিস্তৃত হওয়া। প্রাচীনকালে আরবরা এই মাসে পানির সন্ধানে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত বলে এর এমন নামকরণ। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মাসেই আল্লাহর রহমতের বারিধারা মুমিনদের হৃদয়ে বিস্তৃত হয়। হাদিস শরিফে এর গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহর রাসুল! শাবান মাসে আপনাকে যেভাবে রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে সেভাবে দেখি না কেন?” নবীজি (সা.) উত্তরে বলেন, ‘এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে অবস্থিত, যার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ এটি এমন এক মাস, যাতে বান্দার আমলগুলো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের দরবারে পেশ করা হয়। আর আমি পছন্দ করি, আমার আমল যখন আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।’ (নাসায়ি : ২৩৫৭)। এই হাদিস থেকেই শাবানের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়, যেখানে বান্দার বার্ষিক আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।

শাবান মাসের আরেকটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, এই মাসেই মুসলমানদের কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে মক্কাতুল মোকাররমার কাবার দিকে পরিবর্তন করা হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আপনার চেহারাকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং যে কিবলাকে আপনি পছন্দ করুন আমি শিগগিরই সেদিকে আপনাকে ফিরিয়ে দেব। সুতরাং এবার মসজিদুল হারামের দিকে নিজের চেহারা ফেরান এবং (ভবিষ্যতে) আপনি যেখানেই থাকুন (সালাত আদায়কালে) নিজের চেহারা সেদিকেই ফেরাবেন।’ (সুরা বাকারা : ১৪৪)। এই আয়াতটিও শাবানেই অবতীর্ণ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

রমজানের প্রস্তুতিমূলক এই মাসে মুমিনদের জন্য কিছু বিশেষ আমল রয়েছে:

১. নফল রোজা ও সিয়াম পালন: রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখতেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। তিনি শাবানের প্রায় পুরো মাসই রোজা রাখতেন।’ (বুখারি : ১৯৬৯)। রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে অভ্যস্ত করতে এই নফল রোজা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

২. কোরআন তিলাওয়াতের বসন্ত: সালাফে সালেহিন (পূর্ববর্তী নেককার বান্দারা) শাবান মাস শুরু হলে কোরআন তিলাওয়াত অনেক বাড়িয়ে দিতেন। তারা এই মাসকে ‘কোরআন পাঠকদের মাস’ বলে অভিহিত করতেন। আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.)-এর মতে, যারা শাবানে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করবে, তাদের জন্য রমজানের তিলাওয়াত সহজ ও স্বাদময় হবে।

৩. তওবা ও আত্মশুদ্ধি: রমজান পবিত্রতার মাস। পাপে কলুষিত আত্মা নিয়ে রমজানের আধ্যাত্মিক নূর অর্জন করা কঠিন। তাই শাবান মাসেই খাঁটি তওবার মাধ্যমে নিজেকে পাপমুক্ত করার চেষ্টা করা উচিত। হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকারের মতো অন্তরের ব্যাধিগুলো দূর করে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার এটিই মোক্ষম সময়।

৪. শবেবরাতের ফজিলত: মধ্য শাবানের রাতটি ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত এবং এটি একটি ফজিলতপূর্ণ রাত। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক (আল্লাহর অংশীদার স্থাপনকারী) ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১৩৯০)। এই রাতে ব্যক্তিগত ইবাদত, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং পরের দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব বা উত্তম আমল।

ইবাদতের পাশাপাশি এই মাসে প্রচলিত কিছু ভুল প্রথা ও কুসংস্কার বর্জন করা মুসলিমদের ঈমানি দায়িত্ব:

উদাসীনতা: রজব ও রমজানের গুরুত্ব দিলেও অনেকে শাবান মাসকে অবহেলা করেন। এই উদাসীনতা পরিহার করা উচিত।
হিংসা ও শত্রুতা: হাদিস অনুযায়ী, যারা অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, আল্লাহ তাদের এ মাসেও ক্ষমা করেন না। তাই সামাজিক ও ব্যক্তিগত কলহ মিটিয়ে ফেলা আবশ্যক।
অতিরঞ্জিত উৎসব: শবেবরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, আলোকসজ্জা বা রাস্তায় হইহুল্লোড় করা ইসলাম সমর্থন করে না। এটি ইবাদত ও আত্মোপলব্ধির রাত, বিনোদনের নয়।
বেহুদা প্রথা: শবেবরাতে ঘটা করে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবারের আয়োজনকে ধর্মের অংশ মনে করা এক ধরনের কুসংস্কার। সাধ্যমতো দান-সদকা করা ভালো, তবে একে নির্দিষ্ট প্রথায় রূপ দেওয়া ঠিক নয়।

পবিত্র শাবান মাস মুমিনের জন্য রমজানের সোপানস্বরূপ। যদি শাবানে আমলের বীজ বপন ও পরিচর্যা না করা হয়, তবে রমজানে তার সুফল আশা করা কঠিন। আসুন, আমরা আমাদের সময়কে ইবাদত, তওবা ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সাজাই এবং একটি সফল রমজান পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তওফিক দান করুন।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘরের মাঠে লঙ্কানদের স্বপ্নভঙ্গ, নিউজিল্যান্ডের দাপুটে জয়ে বিদায় শ্রীলঙ্কার

রমজানের আগমনী বার্তা: প্রস্তুতি ও ইবাদতের মাস পবিত্র শাবান

আপডেট সময় : ০৯:৩৭:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

আরবি হিজরি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস পবিত্র শাবান, যা মুসলিম উম্মাহর কাছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে। মহিমান্বিত রমজানের পরিপূর্ণ বরকত লাভের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার এক বিশেষ সময় এই শাবান। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসটিকে ইবাদতের ‘প্রশিক্ষণকাল’ হিসেবে গণ্য করতেন, যা মুমিনদের আধ্যাত্মিক উন্নতির এক অনন্য সুযোগ করে দেয়।

মূল আরবী শব্দ ‘শাবান’-এর আভিধানিক অর্থ হলো শাখা-প্রশাখা বা বিস্তৃত হওয়া। প্রাচীনকালে আরবরা এই মাসে পানির সন্ধানে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত বলে এর এমন নামকরণ। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মাসেই আল্লাহর রহমতের বারিধারা মুমিনদের হৃদয়ে বিস্তৃত হয়। হাদিস শরিফে এর গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহর রাসুল! শাবান মাসে আপনাকে যেভাবে রোজা রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে সেভাবে দেখি না কেন?” নবীজি (সা.) উত্তরে বলেন, ‘এটি এমন একটি মাস, যা রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী সময়ে অবস্থিত, যার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ এটি এমন এক মাস, যাতে বান্দার আমলগুলো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের দরবারে পেশ করা হয়। আর আমি পছন্দ করি, আমার আমল যখন আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।’ (নাসায়ি : ২৩৫৭)। এই হাদিস থেকেই শাবানের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়, যেখানে বান্দার বার্ষিক আমলনামা আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।

শাবান মাসের আরেকটি ঐতিহাসিক তাৎপর্য হলো, অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, এই মাসেই মুসলমানদের কিবলা বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে মক্কাতুল মোকাররমার কাবার দিকে পরিবর্তন করা হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আপনার চেহারাকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং যে কিবলাকে আপনি পছন্দ করুন আমি শিগগিরই সেদিকে আপনাকে ফিরিয়ে দেব। সুতরাং এবার মসজিদুল হারামের দিকে নিজের চেহারা ফেরান এবং (ভবিষ্যতে) আপনি যেখানেই থাকুন (সালাত আদায়কালে) নিজের চেহারা সেদিকেই ফেরাবেন।’ (সুরা বাকারা : ১৪৪)। এই আয়াতটিও শাবানেই অবতীর্ণ হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

রমজানের প্রস্তুতিমূলক এই মাসে মুমিনদের জন্য কিছু বিশেষ আমল রয়েছে:

১. নফল রোজা ও সিয়াম পালন: রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখতেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে শাবানের মতো এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। তিনি শাবানের প্রায় পুরো মাসই রোজা রাখতেন।’ (বুখারি : ১৯৬৯)। রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে অভ্যস্ত করতে এই নফল রোজা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

২. কোরআন তিলাওয়াতের বসন্ত: সালাফে সালেহিন (পূর্ববর্তী নেককার বান্দারা) শাবান মাস শুরু হলে কোরআন তিলাওয়াত অনেক বাড়িয়ে দিতেন। তারা এই মাসকে ‘কোরআন পাঠকদের মাস’ বলে অভিহিত করতেন। আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলি (রহ.)-এর মতে, যারা শাবানে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করবে, তাদের জন্য রমজানের তিলাওয়াত সহজ ও স্বাদময় হবে।

৩. তওবা ও আত্মশুদ্ধি: রমজান পবিত্রতার মাস। পাপে কলুষিত আত্মা নিয়ে রমজানের আধ্যাত্মিক নূর অর্জন করা কঠিন। তাই শাবান মাসেই খাঁটি তওবার মাধ্যমে নিজেকে পাপমুক্ত করার চেষ্টা করা উচিত। হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকারের মতো অন্তরের ব্যাধিগুলো দূর করে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করার এটিই মোক্ষম সময়।

৪. শবেবরাতের ফজিলত: মধ্য শাবানের রাতটি ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত এবং এটি একটি ফজিলতপূর্ণ রাত। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘আল্লাহ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং মুশরিক (আল্লাহর অংশীদার স্থাপনকারী) ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১৩৯০)। এই রাতে ব্যক্তিগত ইবাদত, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং পরের দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব বা উত্তম আমল।

ইবাদতের পাশাপাশি এই মাসে প্রচলিত কিছু ভুল প্রথা ও কুসংস্কার বর্জন করা মুসলিমদের ঈমানি দায়িত্ব:

উদাসীনতা: রজব ও রমজানের গুরুত্ব দিলেও অনেকে শাবান মাসকে অবহেলা করেন। এই উদাসীনতা পরিহার করা উচিত।
হিংসা ও শত্রুতা: হাদিস অনুযায়ী, যারা অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, আল্লাহ তাদের এ মাসেও ক্ষমা করেন না। তাই সামাজিক ও ব্যক্তিগত কলহ মিটিয়ে ফেলা আবশ্যক।
অতিরঞ্জিত উৎসব: শবেবরাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, আলোকসজ্জা বা রাস্তায় হইহুল্লোড় করা ইসলাম সমর্থন করে না। এটি ইবাদত ও আত্মোপলব্ধির রাত, বিনোদনের নয়।
বেহুদা প্রথা: শবেবরাতে ঘটা করে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ খাবারের আয়োজনকে ধর্মের অংশ মনে করা এক ধরনের কুসংস্কার। সাধ্যমতো দান-সদকা করা ভালো, তবে একে নির্দিষ্ট প্রথায় রূপ দেওয়া ঠিক নয়।

পবিত্র শাবান মাস মুমিনের জন্য রমজানের সোপানস্বরূপ। যদি শাবানে আমলের বীজ বপন ও পরিচর্যা না করা হয়, তবে রমজানে তার সুফল আশা করা কঠিন। আসুন, আমরা আমাদের সময়কে ইবাদত, তওবা ও কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে সাজাই এবং একটি সফল রমজান পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তওফিক দান করুন।