সোমবার (২৭ অক্টোবর) ঢাকার ডিসিসিআই মিলনায়তনে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে স্মার্ট মানবসম্পদ উন্নয়ন’ নামে একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সেখানেই বিশেষজ্ঞরা এই কথাগুলো বলেন। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী।
আলোচনার শুরুতে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুধু প্রযুক্তির বদল নয়, এটি আমাদের উৎপাদন, ব্যবসা এবং চাকরির বাজারেও বিরাট পরিবর্তন এনেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখনই শিল্প ও সেবা খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।”
তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য দিয়ে বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই বিশ্বের চাকরির বাজারের চারভাগের একভাগই বদলে যাবে। বাংলাদেশ যখন এলডিসি থেকে বের হয়ে আসবে, তখন এই প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার জন্য স্মার্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানুষই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। এ জন্য তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির ওপর জোর দেন।
প্রধান অতিথি ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, “দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যেই এখনো সমন্বয়ের অভাব আছে। পাশাপাশি, মানবসম্পদ উন্নয়নের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও একটা বড় বাধা।”
তিনি জানান, জাপানে এক লাখ দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর জন্য এরই মধ্যে জাপানি ভাষা শেখানোর কাজ শুরু হয়েছে। সেই সাথে নারীদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের কাজ করার এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
এই আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ। তিনি বলেন, এটুআই ও ইউএনডিপি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তি-নির্ভর উৎপাদন বা অটোমেশনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, খাদ্য, কৃষি, ফার্নিচার এবং পর্যটন ও হসপিটালিটি খাতে প্রায় ৫৩ লাখ ৮০ হাজার চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, “এই কঠিন বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে আমাদের দেশের মানুষকে প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে এবং এজন্য প্রশিক্ষণ ও বাজেট বরাদ্দ দুটোই বাড়াতে হবে।”
আলোচনায় অংশ নিয়ে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ সাইফুল হাসান বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য হাই-টেক পার্কে যৌথভাবে কাজ করা যেতে পারে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাসরুর আলী বলেন, “আমাদের গ্রাম ও শহরের শিক্ষার মানের মধ্যে বিরাট তফাৎ রয়ে গেছে। যদি প্রাথমিক পর্যায় থেকেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তবে দক্ষ মানুষ তৈরি করা খুবই কঠিন হবে।”
ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সিইও রাইসুল কবীর বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে চাকরি কমবে না, বরং দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন করাটা এখন খুবই জরুরি।”
আইসিএমএবি সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদ জানান, দেশের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ তাদের দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি পায় এবং দেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বেকার। তিনি বলেন, এই অবস্থা বদলাতে হলে কারিগরি শিক্ষাকে আরও ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এ বিষয়ে সমাজের মানুষের মানসিকতাও পরিবর্তন করা জরুরি।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস রহমান বলেন, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারছে না। শিক্ষা খাত আর শিল্প খাত এক হয়ে কাজ না করলে এই ঘাটতি কখনোই পূরণ হবে না।”
মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই-এর সাবেক সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ বিদেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এটা করতে পারলে আমাদের রেমিট্যান্স আয়ের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে যেতে পারে।
সভায় আরও কথা বলেন ডিসিসিআই পরিচালক মোহাম্মদ জমশের আলী, মীর শাহরুক ইসলাম এবং আরও অনেকে।
এই অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই-এর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এবং বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রিপোর্টারের নাম 
























