আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে গুরুতর অসঙ্গতি ও তথ্য গোপনের চিত্র উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, ২১ জন প্রার্থী নাগরিকত্ব ত্যাগের ঘোষণা দিলেও দুজন প্রার্থী এখনো ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বহাল রেখেছেন, যা তাদের হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। যদিও টিআইবি এই দুই প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেনি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অবহিত করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থা আরও উল্লেখ করেছে, একজন প্রার্থীর ঘোষিত নির্ভরশীল ব্যক্তির নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে ১.৪ মিলিয়ন পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১০ কোটি টাকা) মূল্যের একটি বাড়ি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। অথচ এই সম্পদের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রার্থী তার হলফনামায় উল্লেখ করেননি। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এই বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে দুবাই, আরব আমিরাতে নিবন্ধিত একটি শেল কোম্পানির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, আরেকজন প্রার্থী তার নিজের কোনো বিদেশি সম্পদের তথ্য জমা না দিলেও, তার স্ত্রীর নামে দুবাইতে একটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য টিআইবির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির প্রধান কার্যালয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণের ওপর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রার্থীদের জমাকৃত হলফনামা অনেক ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছ। এবারের নির্বাচনে কোনো ইসলামপন্থী দল নারী প্রার্থী দেয়নি। একটি বড় দল একজন প্রভাবশালী নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি, কারণ ওই আসনে অন্য একটি দলের প্রার্থী রয়েছেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও জানান, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ২১ জন প্রার্থী বিদেশের উৎস থেকে আয় করেন। ২৫ জন প্রার্থী বিদেশে অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিনিয়োগের তথ্য দিয়েছেন। ১৭ জন প্রার্থী বাংলাদেশের বাইরে স্থাবর সম্পদ বা জমির মালিকানার হিসাব জমা দিয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে অর্থ বা ব্যবসাই মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতে অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মের একাকার হয়ে যাওয়া এক ধরনের জিম্মি অবস্থা তৈরি করছে এবং অসুস্থ রাজনীতি সুস্থ রাজনীতির ধারক-বাহকের জায়গা দখল করে নিচ্ছে।
টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী রয়েছেন ১৯৮১ জন, যা ৫১টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছে। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী ৪.০২ শতাংশ এবং পুরুষ ৯৫.৯৮ শতাংশ। ইসলামপন্থী দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৩৬.৩৫ শতাংশ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রার্থীদের গড় বয়স ৫১.৮ বছর, যার মধ্যে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ (৬৫১ জন)। প্রথমবারের মতো নির্বাচন করছেন ১৬৯৬ জন প্রার্থী। মোট প্রার্থীর ৭৬.৪২ শতাংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং ৪৮ শতাংশ প্রার্থী ব্যবসায়ী।
আয়ের হিসাবে দেখা যায়, প্রায় ২৮ শতাংশ প্রার্থী বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কম আয় করেন, যা তাদের করের আওতার বাইরে রাখে। অন্যদিকে, ১২৪ জন প্রার্থী বছরে ১ কোটি টাকার বেশি আয় করেন। শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক প্রার্থীর সংখ্যা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সর্বোচ্চ ৬১৯ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্পদের মালিকানা রয়েছে বিএনপির আব্দুল আওয়াল মিন্টুর। কমপক্ষে ৩টি দালান বা অ্যাপার্টমেন্ট, খামার বা বাগান রয়েছে এমন প্রার্থীর সংখ্যা ২৯৭ জন। দায় বা ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর সংখ্যাও বিএনপিতে বেশি বলে টিআইবি জানিয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
















