অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সবচেয়ে অকার্যকর ও বিতর্কিত দপ্তরের তকমা পেয়েছে। ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’ বলা হলেও গত কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়টি নিজেই মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, এই সময়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন বা রুটিন মাফিক কার্যক্রমের চেয়ে রাজনৈতিক দখলদারি ও জামায়াতীকরণের গতি ছিল কয়েকগুণ বেশি। সরকারের বিদায়লগ্নে এসে এখন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ, পদোন্নতি ও এমপিওভুক্তির নামে ‘আখেরি লুটপাটে’র মহোৎসব চলছে।
শিক্ষা খাতের এই অস্থিতিশীলতায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। নির্ধারিত সময়ে বই পৌঁছাতে ব্যর্থতা, সাত কলেজের সংকট নিরসনে অযোগ্যতা এবং নিচুমানের পাঠ্যপুস্তকের বিতর্কের মাঝেও নজিরবিহীনভাবে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। গত ১১ ডিসেম্বর এক রাতেই ৫২৫ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, যা শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
এমপিওভুক্তি ও নিয়োগে অস্বচ্ছতা
নির্বাচনের মাত্র এক মাস বাকি থাকতে তড়িঘড়ি করে দেড় হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই ও মাঠ পরিদর্শনে অন্তত ছয় মাস সময় লাগলেও মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে আবেদন গ্রহণ ও চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় দেশজুড়ে প্রশ্ন ফাঁস ও জালিয়াতির অসংখ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে ফলাফল ঘোষণা ও নিয়োগ সম্পন্ন করার তোড়জোড় চলছে। অভিযোগ রয়েছে যে, এর মাধ্যমে বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে।
সিন্ডিকেট বাণিজ্য ও রাজনৈতিক দূষণ
শিক্ষা প্রশাসনে বর্তমানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটে শিক্ষা উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি, পিএস এবং মাউশির কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ৫ আগস্টের আগে যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে রাজপথে মিছিল করেছিল, তাদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা নিয়ে মাউশি ও ঢাকার বিভিন্ন লোভনীয় পদে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রতিযোগিতায় বিএনপির নামধারী কিছু কর্মকর্তাও নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত রয়েছেন।
শিক্ষা রুটিনে বিশৃঙ্খলা ও শিক্ষক আন্দোলন
মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তিদের পরোক্ষ প্রশ্রয়ে শিক্ষকরা বছরের দীর্ঘ সময় ক্লাস ছেড়ে রাজপথে কাটিয়েছেন। ফলে শিক্ষা ক্যালেন্ডার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত রাস্তা অবরোধ করে রাজধানীবাসীকে ভোগান্তিতে ফেলছেন, যার কোনো টেকসই সমাধান মন্ত্রণালয় দিতে পারেনি। এনসিটিবি ও মাউশির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে শিক্ষা খাতের এই অস্থিরতা এবং নজিরবিহীন নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যকে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটসহ বিভিন্ন সংগঠন ‘লুটপাটের আখেরি আয়োজন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলা সিদ্ধান্তগুলো কেবল একটি নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই হওয়া উচিত ছিল।
রিপোর্টারের নাম 

























