ঢাকা ০৪:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

রাষ্ট্র সংস্কারে নতুন রাজনৈতিক অনুসন্ধান: এনপিএ ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৫:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক গভীর দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থান সমাজে আমূল পরিবর্তনের বিপুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে; অন্যদিকে, সেই আকাঙ্ক্ষাকে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথাগত শক্তিগুলোর ব্যর্থতা প্রকট হয়ে উঠেছে। এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই আবির্ভূত হয়েছে নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ (এনপিএ)। সংগঠনটি নিজেকে প্রচলিত বাম, ডান বা মধ্যপন্থী কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক বলয়ে আবদ্ধ না রেখে বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতার ভিত্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়েছে।

এনপিএ-র মতো উদ্যোগের উত্থান মূলত পুরোনো রাজনৈতিক ধারাগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতারই প্রতিফলন। দীর্ঘকাল ধরে যারা ক্ষমতার বাইরে থেকে নৈতিক রাজনীতির কথা বলেছেন, তাদের অনেকেই জনগণের বাস্তব সংকটের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষ প্রথাগত নেতৃত্ব ছাড়াই নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। তবে এই ঐতিহাসিক শক্তিকে কেবল স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ভবিষ্যতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো। এনপিএ জুলাইয়ের সেই অসমাপ্ত প্রশ্নগুলোকেই রাষ্ট্র সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা গণতন্ত্র, সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে নিছক সস্তা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে না রেখে একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক নৈতিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই নতুন প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বড় শক্তি ও চ্যালেঞ্জ হলো এর বহুমাত্রিকতা। এখানে যেমন বামপন্থী চিন্তার দীর্ঘদিনের সংগঠক ও কর্মীরা রয়েছেন, তেমনি যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলন, ধর্মীয় সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ। এই বৈচিত্র্য যেমন সংগঠনের ভেতরে সংলাপের একটি বড় পরিসর তৈরি করছে, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক স্মৃতি ও ব্যর্থতার ভার এক জায়গায় জড়ো হওয়ায় এক ধরনের জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এই উদ্যোগের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। অতীতের রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে এই দ্বন্দ্বে চরমপন্থা বা সুবিধাবাদী নীরবতা বেছে নিয়েছে, সেখানে এনপিএ-র সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত থাকবে একটি সর্বজনীন ভাষা নির্মাণের ওপর—যেখানে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও রাষ্ট্রের কোনো নীতিতে একক আধিপত্য প্রশ্নাতীত হবে না।

শেষ পর্যন্ত এনপিএ-র গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে তাদের নথিপত্রের চেয়েও দৈনন্দিন রাজনৈতিক আচরণের ওপর। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক আশাব্যঞ্জক উদ্যোগই ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অতি সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠন এই ধরনের আশঙ্কার পথ প্রশস্ত করেছে। এনপিএ যদি অতীত ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক স্বচ্ছতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে পারে, তবেই তারা নাগরিক জীবনের সংকটগুলোকে রাজনীতির মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। আদর্শিক লেবেলের চেয়ে বাস্তব মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানই বলে দেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্তে এনপিএ নতুন কোনো সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারবে কি না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বৈঠক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা

রাষ্ট্র সংস্কারে নতুন রাজনৈতিক অনুসন্ধান: এনপিএ ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতা

আপডেট সময় : ১০:০৫:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক গভীর দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। একদিকে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থান সমাজে আমূল পরিবর্তনের বিপুল প্রত্যাশা তৈরি করেছে; অন্যদিকে, সেই আকাঙ্ক্ষাকে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথাগত শক্তিগুলোর ব্যর্থতা প্রকট হয়ে উঠেছে। এই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই আবির্ভূত হয়েছে নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ (এনপিএ)। সংগঠনটি নিজেকে প্রচলিত বাম, ডান বা মধ্যপন্থী কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক বলয়ে আবদ্ধ না রেখে বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতার ভিত্তি নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার এক ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়েছে।

এনপিএ-র মতো উদ্যোগের উত্থান মূলত পুরোনো রাজনৈতিক ধারাগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতারই প্রতিফলন। দীর্ঘকাল ধরে যারা ক্ষমতার বাইরে থেকে নৈতিক রাজনীতির কথা বলেছেন, তাদের অনেকেই জনগণের বাস্তব সংকটের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষ প্রথাগত নেতৃত্ব ছাড়াই নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। তবে এই ঐতিহাসিক শক্তিকে কেবল স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ভবিষ্যতে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো। এনপিএ জুলাইয়ের সেই অসমাপ্ত প্রশ্নগুলোকেই রাষ্ট্র সংস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা গণতন্ত্র, সাম্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে নিছক সস্তা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে না রেখে একটি সর্বজনীন রাজনৈতিক নৈতিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই নতুন প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বড় শক্তি ও চ্যালেঞ্জ হলো এর বহুমাত্রিকতা। এখানে যেমন বামপন্থী চিন্তার দীর্ঘদিনের সংগঠক ও কর্মীরা রয়েছেন, তেমনি যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলন, ধর্মীয় সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ। এই বৈচিত্র্য যেমন সংগঠনের ভেতরে সংলাপের একটি বড় পরিসর তৈরি করছে, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক স্মৃতি ও ব্যর্থতার ভার এক জায়গায় জড়ো হওয়ায় এক ধরনের জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এই উদ্যোগের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। অতীতের রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে এই দ্বন্দ্বে চরমপন্থা বা সুবিধাবাদী নীরবতা বেছে নিয়েছে, সেখানে এনপিএ-র সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত থাকবে একটি সর্বজনীন ভাষা নির্মাণের ওপর—যেখানে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেও রাষ্ট্রের কোনো নীতিতে একক আধিপত্য প্রশ্নাতীত হবে না।

শেষ পর্যন্ত এনপিএ-র গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে তাদের নথিপত্রের চেয়েও দৈনন্দিন রাজনৈতিক আচরণের ওপর। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক আশাব্যঞ্জক উদ্যোগই ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। অতি সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠন এই ধরনের আশঙ্কার পথ প্রশস্ত করেছে। এনপিএ যদি অতীত ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক স্বচ্ছতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে পারে, তবেই তারা নাগরিক জীবনের সংকটগুলোকে রাজনীতির মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে। আদর্শিক লেবেলের চেয়ে বাস্তব মানুষের বাস্তব সমস্যার সমাধানই বলে দেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দিগন্তে এনপিএ নতুন কোনো সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারবে কি না।