দীর্ঘ দেড় দশকের তিক্ততা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির ‘ভাবী কর্ণধার’ হিসেবে তারেক রহমানের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছে ভারত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট দিল্লিকে তাদের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন প্রথমবারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন লন্ডনে নির্বাসিত বিএনপি নেতা তারেক রহমান দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের একটি বড় সুযোগ দেখেছিলেন। তখন ভারতের নতুন শাসক দল বিজেপি এবং বাংলাদেশের বিএনপি—উভয়ই দক্ষিণপন্থি রাজনীতির দর্শনে বিশ্বাসী হওয়ায় একটি ‘স্বাভাবিক মিত্রতা’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের প্রবল কূটনৈতিক চাপ এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তারেক রহমানের ‘প্রশ্নবিদ্ধ অতীত’ সেই সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তারেক রহমানের জড়িত থাকার বিষয়ে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর এতটাই গভীর উদ্বেগ ছিল যে, তারা মনে করত তারেক রহমান ভারতের নিরাপত্তার ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করেছেন।
ভারতের মনোভাব পরিবর্তনের নেপথ্য কারণসমূহ:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার বিদায়ের পর দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ভারত উপলব্ধি করে যে, তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু আওয়ামী লীগের দ্রুত রাজনৈতিক পুনর্বাসন প্রায় অসম্ভব। পাশাপাশি বিএনপি সম্পর্কে দিল্লির মনোভাব নমনীয় হওয়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, ভারত সবসময়ই বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নিয়ে শঙ্কিত থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব এবং নির্বাচনী সমঝোতা না হওয়ার বিষয়টি ভারতকে আশ্বস্ত করেছে। দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে প্রবল ভারত-বিরোধী হাওয়া বইলেও বিএনপি দলগতভাবে উগ্র ভারত-বিদ্বেষী কোনো অবস্থান নেয়নি। তারেক রহমান বরং ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের করা চুক্তিগুলো সরাসরি খারিজ না করে একটি দ্বিপাক্ষিক মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের ওপর জোর দিয়েছেন।
নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ:
ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পেছনে কেবল রাজনীতি নয়, রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও। শেখ হাসিনার আমলে ভারত বাংলাদেশে শত শত কোটি ডলারের বিভিন্ন প্রকল্প এবং কানেক্টিভিটিতে বিনিয়োগ করেছিল। বর্তমানে আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগসহ অসংখ্য প্রকল্পের কাজ থমকে আছে। আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য এবং পর্যটন শিল্পেও ধস নেমেছে। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার না আসা পর্যন্ত এই স্থবিরতা কাটবে না। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়া এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর আবার সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
তারেক রহমানই কি দিল্লির একমাত্র বিকল্প?
বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি এখন তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। লন্ডনে থাকাকালীন তারেক রহমানের দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং ভারতের সঙ্গে তাঁর দলের যোগাযোগ রক্ষা করার কৌশল সফল হয়েছে। তিনি শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার ইস্যুতে সরাসরি ভারতকে আক্রমণ না করে কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন, যা দিল্লির ইতিবাচক নজরে পড়েছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফরে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়া একটি বড় কূটনৈতিক বার্তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুকল্যাণ গোস্বামীর মতে, ভারতের জন্য এই মুহূর্তে বিএনপি-ই একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প, এবং সেই কারণেই দিল্লি এখন তারেক রহমানের সঙ্গে একটি টেকসই ও নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক গড়তে মরিয়া।
রিপোর্টারের নাম 

























