ঢাকা ০৮:৩৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশে সাত মাসে ১১৬ হিন্দু খুন: এইচআরসিবিএম-এর রিপোর্টে অস্বস্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত ও নির্যাতনের এক লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)। তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে দেশজুড়ে অন্তত ১১৬ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল অস্বস্তির মুখে পড়েছে। এইচআরসিবিএম-এর তথ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডগুলো বাংলাদেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের অন্তত ৪৫টি জেলায় সংঘটিত হয়েছে। সংগঠনটি মনে করে, দেশব্যাপী এই হিংসার বিস্তার প্রমাণ করে যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংখ্যালঘু নিধনের এক পরিকল্পিত ও ভয়াবহ অধ্যায়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ধরন ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ:

প্রতিবেদনে মৃত ব্যক্তিদের ধরন বিশ্লেষন করে বলা হয়েছে যে, মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৮.৩ শতাংশই ছিল লক্ষ্যভিত্তিক বা টার্গেটেড হামলা। এর বাইরে ১০.৩ শতাংশ মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১২.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত বা রহস্যজনক রয়ে গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশি হেফাজতে বা অত্যাচারে ৬.৯ শতাংশ এবং সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে ৮.৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই মৃত্যুগুলোকে কেবল সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি:

এইচআরসিবিএম তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন গত আট দশক ধরে চলে আসা এক নিরবচ্ছিন্ন সংকট। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে (২০০১, ২০২১, ২০২৪ ও ২০২৫) সংখ্যালঘুরা বারবার বাস্তুচ্যুত ও হামলার শিকার হয়েছে। ১৯৪৬ সালে যেখানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ, সেখানে ২০২০ সালে তা নেমে এসেছে ৯ শতাংশের নিচে। এই দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা হ্রাসের পেছনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এই হিংসাকেই দায়ী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে গত ডিসেম্বরে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে, ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অজুহাতে গণপিটুনি ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা সংখ্যালঘু সমাজে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা করতে চাইলেও পুলিশ তা নিতে অস্বীকৃতি জানায় কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়। নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, ফলে তাদের অনুপস্থিতিতে পরিবারগুলো চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছে। এইচআরসিবিএম-এর মতে, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে এবং দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচাতে প্রতিটি উপজেলায় হচ্ছে আধুনিক পরীক্ষা কেন্দ্র

বাংলাদেশে সাত মাসে ১১৬ হিন্দু খুন: এইচআরসিবিএম-এর রিপোর্টে অস্বস্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার

আপডেট সময় : ০৩:৫৪:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত ও নির্যাতনের এক লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)। তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে দেশজুড়ে অন্তত ১১৬ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল অস্বস্তির মুখে পড়েছে। এইচআরসিবিএম-এর তথ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডগুলো বাংলাদেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগের অন্তত ৪৫টি জেলায় সংঘটিত হয়েছে। সংগঠনটি মনে করে, দেশব্যাপী এই হিংসার বিস্তার প্রমাণ করে যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংখ্যালঘু নিধনের এক পরিকল্পিত ও ভয়াবহ অধ্যায়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ধরন ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ:

প্রতিবেদনে মৃত ব্যক্তিদের ধরন বিশ্লেষন করে বলা হয়েছে যে, মোট মৃত্যুর প্রায় ৪৮.৩ শতাংশই ছিল লক্ষ্যভিত্তিক বা টার্গেটেড হামলা। এর বাইরে ১০.৩ শতাংশ মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১২.৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত বা রহস্যজনক রয়ে গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশি হেফাজতে বা অত্যাচারে ৬.৯ শতাংশ এবং সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে ৮.৬ শতাংশ মানুষের মৃত্যু নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই মৃত্যুগুলোকে কেবল সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এর পেছনে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি:

এইচআরসিবিএম তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন গত আট দশক ধরে চলে আসা এক নিরবচ্ছিন্ন সংকট। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে (২০০১, ২০২১, ২০২৪ ও ২০২৫) সংখ্যালঘুরা বারবার বাস্তুচ্যুত ও হামলার শিকার হয়েছে। ১৯৪৬ সালে যেখানে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ, সেখানে ২০২০ সালে তা নেমে এসেছে ৯ শতাংশের নিচে। এই দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা হ্রাসের পেছনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এই হিংসাকেই দায়ী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে গত ডিসেম্বরে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবকের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে, ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অজুহাতে গণপিটুনি ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা সংখ্যালঘু সমাজে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মামলা করতে চাইলেও পুলিশ তা নিতে অস্বীকৃতি জানায় কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়। নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, ফলে তাদের অনুপস্থিতিতে পরিবারগুলো চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছে। এইচআরসিবিএম-এর মতে, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে এবং দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে হুমকির মুখে ফেলছে।