সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে গুমকে একটি ভয়ংকর প্রথায় পরিণত করা হয়েছিল—গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের ২২৯ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
গত ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে গুমের শিকার ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। কমিশন জানিয়েছে, গুমের এই ব্যবস্থার মূল নকশাকার ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই তিন জন সরাসরি গুমের আদেশ ও তত্ত্বাবধানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।
নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা: তদন্ত প্রতিবেদনে নির্যাতনের এমন কিছু বর্ণনা রয়েছে যা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো। ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি অনুযায়ী:
- বৈদ্যুতিক শক ও শারীরিক নিগ্রহ: একজন বিএনপি কর্মীকে পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখার অপরাধে নগ্ন করে গোপনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হতো। জ্ঞান হারালে তাঁকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো হতো।
- মানসিক ও শারীরিক বিকলাঙ্গতা: একজন ছাত্রশিবির কর্মীকে টানা দুই মাস চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল, যার ফলে তাঁর চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়। টর্চার সেলে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে অন্যদের আর্তনাদ আড়াল করা হতো, যা ভুক্তভোগীদের মনে আজীবন ট্রমা তৈরি করেছে।
- নারীদের ওপর পাশবিক নিষ্ঠুরতা: গুমের শিকার এক ছাত্রীর জবানবন্দি অনুযায়ী, তাঁকে হাত-পা ছড়িয়ে ক্রুশবিদ্ধ করার মতো ভঙ্গিতে ঝুলিয়ে রাখা হতো। হিজাব ও ওড়না কেড়ে নিয়ে তাঁকে পুরুষ কর্মকর্তাদের সামনে প্রদর্শন করা হতো। এমনকি অসুস্থ অবস্থায় তাঁর ঋতুস্রাব শুরু হলে প্যাড না দিয়ে তা নিয়ে হাসাহাসি করত দায়িত্বরত ব্যক্তিরা।
ভারত কানেকশন ও অন্যান্য তথ্য: কমিশন সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া বা পুশব্যাক করা ব্যক্তিদের বিষয়েও তদন্ত করেছে। ভারত সরকার তাদের কারাগারে থাকা ৩ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশির তালিকা দিলেও, নিখোঁজ হওয়া হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের কাউকেই সেই তালিকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, গুমের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক এবং এটি মূলত ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























