আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একই দিনে জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে সারা দেশে চলছে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও প্রস্তুতি। বিশেষ করে গণভোটে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনে সরকারি প্রশাসন, তথ্য অফিস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। তবে দেশজুড়ে এই প্রচারণা সত্ত্বেও, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো গণভোটের উদ্দেশ্য, প্রক্রিয়া বা ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাননি, যা সুষ্ঠু ও অর্থবহ গণভোট আয়োজনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
জোরদার প্রচারণা ও প্রশাসনিক তৎপরতা
দেশের বিভিন্ন জেলায় গণভোট নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফরিদপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুব সংগঠন জাতীয় যুব শক্তি, ফরিদপুর জেলা শাখা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। সংগঠনটির আহ্বায়ক জুনায়েদ মাহমুদ বলেন, “২৪ পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি, আর সে লক্ষ্যে গণভোটে অংশ নিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জয়যুক্ত করতে হবে।” তিনি আরও দাবি করেন, যারা নতুন করে ফ্যাসিবাদী হতে চায়, তারাই কেবল ‘না’ ভোটের পক্ষে থাকবে।
পটুয়াখালীতে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বর্ণিল রোড শো’র উদ্বোধন করা হয়। জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী জানান, নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে এবং গণভোটে সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই রোড শো’র আয়োজন। তিনি ভোটারদের দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দেওয়ার বিষয়ে সচেতন করেন এবং উল্লেখ করেন যে ‘হ্যাঁ’ ভোট জুলাই সনদসহ বিভিন্ন সুবিধা দ্রুত নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে, মাগুরায় রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জেলার ৩০১টি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন এবং ৭০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন সম্পন্ন করেছেন। তিনি নির্বাচনে কোনো শৈথিল্য বা অনিয়মের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান জানান, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে স্তরভিত্তিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পটিয়ায় উপজেলা তথ্য অফিস মাইকিং, ছোট নাটিকা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে গণভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে। ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের নিয়ে অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গঠনে উঠান বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায়ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে র্যালি, মতবিনিময় সভা ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায়ও জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের উপস্থিতিতে নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মতবিনিময় সভা হয়েছে। গাজীপুরের শ্রীপুরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে এক অবহিতকরণ সভায় জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম হোসেন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে প্রশাসনের সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা জানান এবং গুজব মোকাবিলায় সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
গ্রামীণ জনপদে সচেতনতার অভাব
তবে দেশজুড়ে এমন প্রচারণার মধ্যেও নাটোরের নলডাঙ্গা, নীলফামারীর সৈয়দপুর এবং যশোরের চৌগাছা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার অভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক ভোটারই জানেন না গণভোট কী, কেন এটি হচ্ছে বা ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের অর্থ কী। স্থানীয়দের অভিযোগ, “দেশের চাবি আপনার হাতে” স্লোগান সামনে রেখে ডিজিটাল বিলবোর্ড, প্রচার গাড়ি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হলেও তা মূলত জেলা শহর ও অনলাইনকেন্দ্রিক।
নলডাঙ্গার অটোচালক মো. নূর মোহাম্মদ বলেন, “এমপি ভোট দিতে যাব—এটা জানি। কিন্তু গণভোট কী, সেখানে কী দিতে হবে—আমি কিছুই জানি না। কেউ আমাকে এ বিষয়ে বুঝিয়ে বলেনি।” একই ধরনের কথা জানান শাখারীপাড়া গ্রামের দিনমজুর মো. মাহাবুব এবং পাটুল গ্রামের কৃষক মো. মোস্তফা। সৈয়দপুরের আতিয়ার কলোনীর পান বিক্রেতা জসিম, অটোচালক ময়নুল এবং মুদি ব্যবসায়ী আব্দুর রহিমও গণভোট সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এমনকি সৈয়দপুরের ২২টি উর্দুভাষী ক্যাম্পের ৪২ হাজার ভোটারের মধ্যেও গণভোট নিয়ে কোনো ধারণা নেই বলে জানা গেছে।
চৌগাছায়ও সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা থাকলেও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তেমন কোনো প্রচার চোখে পড়ছে না। প্রেসক্লাব চৌগাছার সহ-সভাপতি রহিদুল খান ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে ভোটারদের অজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। স্থানীয় বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও প্রচারণায় দুর্বলতার কথা স্বীকার করে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সক্রিয় হওয়ার কথা বলেছেন।
উপজেলা পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, চেয়ারম্যান বা এমপি নির্বাচন মানুষ সহজে বুঝলেও গণভোটের মতো সাংবিধানিক বিষয়টি এখনো গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্ট। সময়মতো সঠিক তথ্য না পেলে সাধারণ ভোটাররা ভোটের দিন বিভ্রান্ত হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা। অনেক সচেতন নাগরিকের দাবি, অবিলম্বে গ্রামভিত্তিক গণভোট সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করে মাঠপর্যায়ে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের সরাসরি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় এই গুরুত্বপূর্ণ গণভোট অংশগ্রহণহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ইতিহাসে স্থান নিতে পারে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, জনসচেতনতা বাড়াতে মাইকিংসহ প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং তা আরও বাড়ানো হবে। হ্যান্ডবিল বিতরণ, ব্যানার টানানো, ইউনিয়ন পর্যায়ে মাইকিং এবং ভিডিও চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পরিবার এবং সার ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের কাছেও গণভোটের তথ্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সচেতন মহল বলছেন, এই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে।
রিপোর্টারের নাম 

























