ঢাকা ০৬:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬

শরীয়তপুরে স্কুলছাত্র নিবিড় হত্যা মামলার রায়: ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড, একজনের কারাদণ্ড

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:৫৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

শরীয়তপুরে বহুল আলোচিত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিড় হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে এই মামলার অপর এক কিশোর আসামিকে ২১ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের খিলগাঁও এলাকার শাকিল হোসেন গাজী (১৯) এবং পাবনার সিংঙ্গা এলাকার সিয়াম হোসেন (২০)। এছাড়া অপরাধে সংশ্লিষ্টতা থাকায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে ২১ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বিকেলে খেলাধুলার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার প্রবাসী মনির খান ও নিপা আক্তার দম্পতির ১০ বছর বয়সী ছেলে হৃদয় খান নিবিড়। সেদিন সন্ধ্যায় নিবিড়ের মায়ের ফোনে কল করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হলে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তীতে পুলিশ শাকিল হোসেন গাজী, সিয়াম হোসেন ও এক কিশোরকে আটক করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের পরদিন সকালে বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের দাদা মমিন আলী খান বাদী হয়ে পালং মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার প্রথমে থানা পুলিশের কাছে থাকলেও পরবর্তীতে তা পিবিআই-এর হাতে ন্যস্ত হয়। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আজ এই রায় প্রদান করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্তদের আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। এসময় পুলিশি পাহারায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নিবিড়ের বাবা মনির হোসেন খান বলেন, “আমি প্রবাসে থাকাকালীন আমার ছেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। টাকা দেওয়ার আগেই তারা আমার নিষ্পাপ ছেলেকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ বিচার পেয়েছি। আমরা চাই এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।” তবে নিবিড়ের মা নিপা আক্তার কিশোর আসামির দণ্ড নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তারও সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) কামরুল হাসান রায়ের বিষয়ে বলেন, “আসামিদের স্বীকারোক্তি এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি সমাজে অপরাধ দমনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসতিয়াক আহম্মেদ এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, মামলার আলামত সংগ্রহ ও তদন্তে ত্রুটি ছিল এবং তার মক্কেলরা ন্যায়বিচার পাননি। তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান রোকন মনে করেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক রায় দিয়েছেন এবং তারা এতে সন্তুষ্ট।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘জিয়াউর রহমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ভিত্তি তৈরি করেন’

শরীয়তপুরে স্কুলছাত্র নিবিড় হত্যা মামলার রায়: ২ আসামির মৃত্যুদণ্ড, একজনের কারাদণ্ড

আপডেট সময় : ০৫:৫৭:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

শরীয়তপুরে বহুল আলোচিত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় খান নিবিড় হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে এই মামলার অপর এক কিশোর আসামিকে ২১ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ দুই বছর পাঁচ মাস আইনি প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে শরীয়তপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শেখ হাফিজুর রহমান এই রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের খিলগাঁও এলাকার শাকিল হোসেন গাজী (১৯) এবং পাবনার সিংঙ্গা এলাকার সিয়াম হোসেন (২০)। এছাড়া অপরাধে সংশ্লিষ্টতা থাকায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে ২১ বছরের আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট বিকেলে খেলাধুলার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সদর উপজেলার খিলগাঁও এলাকার প্রবাসী মনির খান ও নিপা আক্তার দম্পতির ১০ বছর বয়সী ছেলে হৃদয় খান নিবিড়। সেদিন সন্ধ্যায় নিবিড়ের মায়ের ফোনে কল করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানো হলে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত শুরু হয়। পরবর্তীতে পুলিশ শাকিল হোসেন গাজী, সিয়াম হোসেন ও এক কিশোরকে আটক করে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজের পরদিন সকালে বাড়ির পাশের একটি পরিত্যক্ত জমি থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় নিবিড়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের দাদা মমিন আলী খান বাদী হয়ে পালং মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার প্রথমে থানা পুলিশের কাছে থাকলেও পরবর্তীতে তা পিবিআই-এর হাতে ন্যস্ত হয়। তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১ জুন আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ২১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত আজ এই রায় প্রদান করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রায় ঘোষণার পর দণ্ডপ্রাপ্তদের আদালত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। এসময় পুলিশি পাহারায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নিবিড়ের বাবা মনির হোসেন খান বলেন, “আমি প্রবাসে থাকাকালীন আমার ছেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। টাকা দেওয়ার আগেই তারা আমার নিষ্পাপ ছেলেকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ বিচার পেয়েছি। আমরা চাই এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।” তবে নিবিড়ের মা নিপা আক্তার কিশোর আসামির দণ্ড নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তারও সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) কামরুল হাসান রায়ের বিষয়ে বলেন, “আসামিদের স্বীকারোক্তি এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এটি সমাজে অপরাধ দমনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইসতিয়াক আহম্মেদ এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, মামলার আলামত সংগ্রহ ও তদন্তে ত্রুটি ছিল এবং তার মক্কেলরা ন্যায়বিচার পাননি। তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান রোকন মনে করেন, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সঠিক রায় দিয়েছেন এবং তারা এতে সন্তুষ্ট।