আওয়ামী লীগকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) সরাসরি সিদ্ধান্তে এবং অত্যন্ত সুনিপুণ পরিকল্পনায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলো আয়োজন করা হয়েছিল।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এই নির্বাচনগুলো ছিল মূলত তৎকালীন তিনটি নির্বাচন কমিশন, সিভিল প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একটি বিশেষ অংশের সমন্বিত জালিয়াতির ফল। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এই সময়কালে নির্বাচন পরিচালনার প্রকৃত ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সুকৌশলে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনটি নির্বাচনেই দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার মূল সর্বনাশটি হয়েছে প্রশাসনের অতি-উৎসাহী এবং দলীয় কর্মকর্তাদের হাতেই।
বিগত তিনটি নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনটি সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে গভীর ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হাতে নেয়। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই তারা সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে।
এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩ জন সংসদ সদস্যকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই জয়ী ঘোষণা করা হয়, যা ছিল বিশ্ব ইতিহাসে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের আগের রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় লোকদেখানো প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে ডামি প্রার্থী দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে নিজেদের মনের মতো রায় লিখে নেওয়ার ঘটনা অবিশ্বাস্য।”
তিনি আরও বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্বাচন আয়োজনের নামে পুরো জাতিকেই এক প্রকার শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যারা এই নজিরবিহীন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যেকের চেহারা জাতির সামনে উন্মোচিত হওয়া দরকার। ভবিষ্যতে যেন এমন নির্বাচন-ডাকাতি আর কখনো ঘটতে না পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ অনুগত তৎকালীন ইসি সচিবরা মূলত দলটির আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করেছেন। নির্বাচনি নথি ও তথ্য ধ্বংস করা, বিরোধী প্রার্থীদের নামে গায়েবি মামলা দেওয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মতো গুরুতর অভিযোগগুলো প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে তদন্ত কমিশন বেশ কিছু বৈপ্লবিক সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—নির্বাচন কমিশনের সচিব বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসন ক্যাডার থেকে প্রেষণে কর্মকর্তা নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া।
এছাড়া ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং নির্বাচনে তাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার পথ বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনপ্রধান বিচারপতি শামীম হাসনাইন জানান, ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে একটি গভীর নীল নকশা করা হয়েছিল, যেখানে এমনকি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকেও এই জালিয়াতির প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার দায়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০০৮ সালের নির্বাচনকেও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আওতায় আনার জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 

























