ঢাকা ১২:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

অ্যালগরিদমের ফাঁদে সমাজ: মতবিনিময়ের বদলে বাড়ছে বিদ্বেষ ও মব সহিংসতা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২৯:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর কেবল মতবিনিময়ের জায়গা নয়; বরং এটি বিভাজন, বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়ানোর উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ‘অ্যালগরিদম’। ব্যবহারকারীর পছন্দ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালগরিদমনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জ্ঞানের জানালা খোলার বদলে এক ধরনের দেওয়াল তৈরি করছে, যেখানে মানুষ তথ্য জানছে কম কিন্তু বিশ্বাস করছে বেশি। এই বাস্তবতায় গুজব, উসকানি ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বর্তমানে অপর্যাপ্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিউ ও এনগেজমেন্টের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহৃত এই অ্যালগরিদম কোনো নিরপেক্ষ প্রযুক্তি নয়। এটি ব্যবহারকারীর আবেগ, রাগ ও ঘৃণাকে ট্রিগার করে এমন কনটেন্টই বেশি ছড়িয়ে দেয়। মানুষ যে মতাদর্শে বিশ্বাস করে, অ্যালগরিদম বারবার সেই একই ধরনের পোস্ট ও ভিডিও সামনে নিয়ে আসে, ফলে ভিন্নমতের জায়গাটি অদৃশ্য হয়ে যায়। একে ‘ইকো চেম্বার’ বলা হচ্ছে, যেখানে মানুষ কেবল নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। এতে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কমে গিয়ে মানুষ একে অপরের ‘শত্রু’তে পরিণত হচ্ছে এবং ভার্চুয়াল জগত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এই পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে, যার প্রভাবে যুবসমাজ মব সৃষ্টি ও গণপিটুনির মতো সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩০ জন তরুণের মধ্যে ২৪ জনই স্বীকার করেছেন যে তাদের সামনে ভিন্নমতের কনটেন্ট খুব কম আসে। ২০ জন জানিয়েছেন, উত্তেজক ও নেতিবাচক কনটেন্ট তাদের বেশি আকর্ষণ করে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুকের মতে, এই নেতিবাচক কনটেন্টগুলো ‘ক্রিমিওজেনিক’ বা অপরাধীকরণের উপাদান হিসেবে কাজ করছে। বারবার সহিংস ভিডিও দেখার ফলে মানুষের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে এবং তারা অপরাধকে ‘হিরোইজম’ হিসেবে দেখতে শুরু করছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন, যার অনেকগুলোর সূত্রপাত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা ভিডিও থেকে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অ্যালগরিদম এখন একজন আড়ি পাতা বন্ধুর মতো কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাষ্ট্র এখানে ‘অস্ত্রহীন পাহারাদারের’ মতো ভূমিকা পালন করছে, কারণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ার এই গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় কৌশল বা সরঞ্জাম এখনো আমাদের আয়ত্তে নেই। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ার্নেস ফাউন্ডেশনের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে অঞ্চলভিত্তিক আলাদা নীতিমালা না থাকা একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা বাড়ানো না গেলে অ্যালগরিদমের এই নিয়ন্ত্রণ জনমতকে ভুল পথে চালিত করে এক বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের হামলা

অ্যালগরিদমের ফাঁদে সমাজ: মতবিনিময়ের বদলে বাড়ছে বিদ্বেষ ও মব সহিংসতা

আপডেট সময় : ০৩:২৯:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন আর কেবল মতবিনিময়ের জায়গা নয়; বরং এটি বিভাজন, বিদ্বেষ ও সহিংসতা ছড়ানোর উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর নেপথ্যে কাজ করছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ‘অ্যালগরিদম’। ব্যবহারকারীর পছন্দ ও আচরণ বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যালগরিদমনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন জ্ঞানের জানালা খোলার বদলে এক ধরনের দেওয়াল তৈরি করছে, যেখানে মানুষ তথ্য জানছে কম কিন্তু বিশ্বাস করছে বেশি। এই বাস্তবতায় গুজব, উসকানি ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার ব্যাপক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বর্তমানে অপর্যাপ্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিউ ও এনগেজমেন্টের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহৃত এই অ্যালগরিদম কোনো নিরপেক্ষ প্রযুক্তি নয়। এটি ব্যবহারকারীর আবেগ, রাগ ও ঘৃণাকে ট্রিগার করে এমন কনটেন্টই বেশি ছড়িয়ে দেয়। মানুষ যে মতাদর্শে বিশ্বাস করে, অ্যালগরিদম বারবার সেই একই ধরনের পোস্ট ও ভিডিও সামনে নিয়ে আসে, ফলে ভিন্নমতের জায়গাটি অদৃশ্য হয়ে যায়। একে ‘ইকো চেম্বার’ বলা হচ্ছে, যেখানে মানুষ কেবল নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। এতে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা কমে গিয়ে মানুষ একে অপরের ‘শত্রু’তে পরিণত হচ্ছে এবং ভার্চুয়াল জগত একটি যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার এই পরিবেশকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে, যার প্রভাবে যুবসমাজ মব সৃষ্টি ও গণপিটুনির মতো সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩০ জন তরুণের মধ্যে ২৪ জনই স্বীকার করেছেন যে তাদের সামনে ভিন্নমতের কনটেন্ট খুব কম আসে। ২০ জন জানিয়েছেন, উত্তেজক ও নেতিবাচক কনটেন্ট তাদের বেশি আকর্ষণ করে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুকের মতে, এই নেতিবাচক কনটেন্টগুলো ‘ক্রিমিওজেনিক’ বা অপরাধীকরণের উপাদান হিসেবে কাজ করছে। বারবার সহিংস ভিডিও দেখার ফলে মানুষের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে এবং তারা অপরাধকে ‘হিরোইজম’ হিসেবে দেখতে শুরু করছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে অন্তত ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন, যার অনেকগুলোর সূত্রপাত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব বা ভিডিও থেকে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অ্যালগরিদম এখন একজন আড়ি পাতা বন্ধুর মতো কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, রাষ্ট্র এখানে ‘অস্ত্রহীন পাহারাদারের’ মতো ভূমিকা পালন করছে, কারণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ার এই গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় কৌশল বা সরঞ্জাম এখনো আমাদের আয়ত্তে নেই। সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ার্নেস ফাউন্ডেশনের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে অঞ্চলভিত্তিক আলাদা নীতিমালা না থাকা একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল লিটারেসি বা সচেতনতা বাড়ানো না গেলে অ্যালগরিদমের এই নিয়ন্ত্রণ জনমতকে ভুল পথে চালিত করে এক বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।