ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

ভারতে দিন দিন বাড়ছে মুসলিম বিদ্বেষ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:০৯:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা সপ্তাহ পার হতে না হতেই ফিকে হয়ে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে আকস্মিক বাদ দেওয়ার ঘটনা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে বাংলাদেশের অনীহা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নজিরবিহীন তিক্ততার দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে জয়শঙ্করের ঢাকা ত্যাগের মাত্র তিন দিনের মাথায় ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে কেকেআর (কলকাতা নাইট রাইডার্স) থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা ভারতের ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক অসহিষ্ণু রূপ হিসেবে দেখছেন।

ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে মোস্তাফিজকে বাদ দিলেও বাংলাদেশের ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে মূলত উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ফলাফল হিসেবে গণ্য করছেন। বিজেপি, শিবসেনা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে উগ্র প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার শিকার হতে হয়েছে একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে। ভারত সরকার এবং বিসিসিআই একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়াকে বিশ্ববাসী সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশেষ করে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন, তখন নিরাপত্তার এই অজুহাতকে ‘মুসলিমবিদ্বেষী নাটকের অবতারণা’ ছাড়া আর কিছু বলা কঠিন। এর পাল্টা জবাব হিসেবে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কা বা অন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার দাবি জানিয়েছে এবং আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই ইস্যুটি খোদ ভারতের ভেতরেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও সংসদ সদস্য শশী থারুর বিসিসিআই-এর এই সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানতে চেয়েছেন, লিটন দাস বা সৌম্য সরকারের মতো কোনো হিন্দু ক্রিকেটার হলে কি একই আচরণ করা হতো? থারুর মনে করেন, এই হঠকারী সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উগ্র চাপের মুখে নেওয়া হয়েছে, যা ভারতের কূটনীতি এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে ক্ষুণ্ণ করেছে। এমনকি অনেক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক আইসিসি-র মেরুদণ্ডহীনতার সমালোচনা করে একে ফিফার মতো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বিসিসিআই সভাপতি জয় শাহকে কটাক্ষ করে বলছেন যে, ক্রিকেটের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি দখল করে আছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ময়মনসিংহে একজন হিন্দু যুবক নিহতের ঘটনাকে যেভাবে রঙ চড়িয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র নয়; বরং সরকার দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। বিপরীতে, ভারতে গোরক্ষকদের হাতে মুসলিম নিধনের অসংখ্য ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রকট। খেলাধুলাকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে এবং মুসলিমবিদ্বেষকে উস্কে দিয়ে ভারত যে অসহিষ্ণু ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার এখন ভারতের এই আধিপত্যবাদী মানসিকতার বিপরীতে সমমর্যাদা এবং যৌক্তিক সম্পর্কের দাবিতে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের হামলা

ভারতে দিন দিন বাড়ছে মুসলিম বিদ্বেষ

আপডেট সময় : ০৩:০৯:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা সপ্তাহ পার হতে না হতেই ফিকে হয়ে গেছে। বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে আকস্মিক বাদ দেওয়ার ঘটনা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতে খেলতে বাংলাদেশের অনীহা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নজিরবিহীন তিক্ততার দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে জয়শঙ্করের ঢাকা ত্যাগের মাত্র তিন দিনের মাথায় ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে কেকেআর (কলকাতা নাইট রাইডার্স) থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে বিশ্লেষকরা ভারতের ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির এক অসহিষ্ণু রূপ হিসেবে দেখছেন।

ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে মোস্তাফিজকে বাদ দিলেও বাংলাদেশের ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে মূলত উগ্র সাম্প্রদায়িকতার ফলাফল হিসেবে গণ্য করছেন। বিজেপি, শিবসেনা ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে উগ্র প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার শিকার হতে হয়েছে একজন পেশাদার খেলোয়াড়কে। ভারত সরকার এবং বিসিসিআই একজন শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়াকে বিশ্ববাসী সন্দেহের চোখে দেখছে। বিশেষ করে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন, তখন নিরাপত্তার এই অজুহাতকে ‘মুসলিমবিদ্বেষী নাটকের অবতারণা’ ছাড়া আর কিছু বলা কঠিন। এর পাল্টা জবাব হিসেবে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের পরিবর্তে শ্রীলঙ্কা বা অন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার দাবি জানিয়েছে এবং আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই ইস্যুটি খোদ ভারতের ভেতরেও তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা ও সংসদ সদস্য শশী থারুর বিসিসিআই-এর এই সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানতে চেয়েছেন, লিটন দাস বা সৌম্য সরকারের মতো কোনো হিন্দু ক্রিকেটার হলে কি একই আচরণ করা হতো? থারুর মনে করেন, এই হঠকারী সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উগ্র চাপের মুখে নেওয়া হয়েছে, যা ভারতের কূটনীতি এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে ক্ষুণ্ণ করেছে। এমনকি অনেক ভারতীয় ক্রীড়া সাংবাদিক আইসিসি-র মেরুদণ্ডহীনতার সমালোচনা করে একে ফিফার মতো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বিসিসিআই সভাপতি জয় শাহকে কটাক্ষ করে বলছেন যে, ক্রিকেটের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি দখল করে আছেন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ময়মনসিংহে একজন হিন্দু যুবক নিহতের ঘটনাকে যেভাবে রঙ চড়িয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র নয়; বরং সরকার দ্রুত জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। বিপরীতে, ভারতে গোরক্ষকদের হাতে মুসলিম নিধনের অসংখ্য ঘটনায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রকট। খেলাধুলাকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে এবং মুসলিমবিদ্বেষকে উস্কে দিয়ে ভারত যে অসহিষ্ণু ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার এখন ভারতের এই আধিপত্যবাদী মানসিকতার বিপরীতে সমমর্যাদা এবং যৌক্তিক সম্পর্কের দাবিতে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছে।