ঢাকা ১২:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

‘উইল ফর পিস ২০২৬’: ব্রিকসের নৌ মহড়া থেকে ভারতের দূরত্ব ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৪৫:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিকের মোহনায় দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমনস টাউনে শুরু হয়েছে ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌ মহড়া ‘উইল ফর পিস ২০২৬’। চীন, রাশিয়া ও ইরানের সরাসরি অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মহড়াটি বর্তমান উত্তপ্ত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে জোটের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ভারত এই সামরিক মহড়া থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ সরিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে ব্রাজিল এই আয়োজনে অংশ নিয়েছে কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে। ভারতের এই রহস্যময় অনুপস্থিতি বিশ্বজুড়ে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পিছুটানের প্রধান কারণ হলো ‘ট্রাম্প-ভীতি’ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই ব্রিকস জোটকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি ভূ-রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভারত এই সামরিক মহড়ায় যোগ দিয়ে নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরাগভাজন হতে চায়নি। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হর্ষ পন্থ জানিয়েছেন, ব্রিকস মূলত একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট, সামরিক জোট নয়। তাই ভারত নিজেকে এই বিতর্কিত ‘ওয়ার গেম’-এর সঙ্গে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাইছে না।

এই মহড়াটি এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা সীমান্ত থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং একটি রুশ তেলবাহী ট্যাংকার আটকের পর এই সামরিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে কিউবা, কলম্বিয়া এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধেও সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিয়ে রেখেছেন। এই পরিস্থিতিতে ভারত নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের অংশ হিসেবে জাহির করতে নারাজ। দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্য এই মহড়াকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে, তবে ওয়াশিংটন একে দেখছে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

চীন এই মহড়ায় তাদের আধুনিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘তাংশান’ মোতায়েন করে নিজেদের নৌ-শক্তির সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে, মহড়ায় ভারতের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ব্রিকস জোটের ভেতরে সামরিক ঐক্য নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। দিল্লি মনে করে, এই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘উইল ফর পিস’ মহড়াটি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তি বলয়ের উত্থানকে ত্বরান্বিত করলেও, ভারতের মতো দেশগুলোর দূরত্ব বজায় রাখার নীতি প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনের প্রভাব এখনও এই জোটের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতায় তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান

‘উইল ফর পিস ২০২৬’: ব্রিকসের নৌ মহড়া থেকে ভারতের দূরত্ব ও ট্রাম্প ফ্যাক্টর

আপডেট সময় : ০২:৪৫:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিকের মোহনায় দক্ষিণ আফ্রিকার সাইমনস টাউনে শুরু হয়েছে ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর সপ্তাহব্যাপী যৌথ নৌ মহড়া ‘উইল ফর পিস ২০২৬’। চীন, রাশিয়া ও ইরানের সরাসরি অংশগ্রহণে আয়োজিত এই মহড়াটি বর্তমান উত্তপ্ত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে জোটের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ভারত এই সামরিক মহড়া থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ সরিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে ব্রাজিল এই আয়োজনে অংশ নিয়েছে কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে। ভারতের এই রহস্যময় অনুপস্থিতি বিশ্বজুড়ে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পিছুটানের প্রধান কারণ হলো ‘ট্রাম্প-ভীতি’ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই ব্রিকস জোটকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং একটি ভূ-রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ভারত এই সামরিক মহড়ায় যোগ দিয়ে নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরাগভাজন হতে চায়নি। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক হর্ষ পন্থ জানিয়েছেন, ব্রিকস মূলত একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট, সামরিক জোট নয়। তাই ভারত নিজেকে এই বিতর্কিত ‘ওয়ার গেম’-এর সঙ্গে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব ঝুঁকির মুখে ফেলতে চাইছে না।

এই মহড়াটি এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলা সীমান্ত থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং একটি রুশ তেলবাহী ট্যাংকার আটকের পর এই সামরিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে কিউবা, কলম্বিয়া এবং ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধেও সামরিক ব্যবস্থার হুমকি দিয়ে রেখেছেন। এই পরিস্থিতিতে ভারত নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের অংশ হিসেবে জাহির করতে নারাজ। দক্ষিণ আফ্রিকা অবশ্য এই মহড়াকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে, তবে ওয়াশিংটন একে দেখছে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

চীন এই মহড়ায় তাদের আধুনিক গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘তাংশান’ মোতায়েন করে নিজেদের নৌ-শক্তির সক্ষমতা প্রদর্শন করছে। অন্যদিকে, মহড়ায় ভারতের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ব্রিকস জোটের ভেতরে সামরিক ঐক্য নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। দিল্লি মনে করে, এই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ‘উইল ফর পিস’ মহড়াটি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন শক্তি বলয়ের উত্থানকে ত্বরান্বিত করলেও, ভারতের মতো দেশগুলোর দূরত্ব বজায় রাখার নীতি প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনের প্রভাব এখনও এই জোটের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।