এক অদৃশ্য আড়ালে যেন অবস্থান করছেন ‘দৃ’, যখন তার চারপাশে নাগরিক জীবনের কোলাহল তুঙ্গে। রাজনৈতিক কোন্দল, নিত্যদিনের বাজার-সদাইয়ের হট্টগোল আর রেশনের দীর্ঘ ফিরিস্তি যেন এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি। এই সমাজে কিছু মানুষ কাঁচি হাতে যেন সর্বদা প্রস্তুত, সামান্য ভিন্নতা দেখলেই আক্রমণে উদ্যত। কৃত্রিমতার আবরণে মোড়া এই সমাজে, যেখানে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্রোধ, গ্লানি আর লোভের মতো মানবিক দুর্বলতা, সেখানে ‘দৃ’র মতো নিভৃতচারীরা যেন এক ভিন্ন পথের পথিক। সমস্ত কপটতা আর হিউব্রিস থেকে দূরে, এক ‘শুদ্ধ’ কুঠুরি নিয়ে তিনি আড়ালেই থাকতে চান, কারণ বাইরে শোরগোল বড্ড বেশি।
ধ্রুপদ সঙ্গীতের গভীরতার মতো এক বিচিত্র সমরেখার পথ পেরিয়ে, ‘দৃ’ যেন অবিরাম হেঁটে চলেছেন এক উপবৃত্তাকার পথে। এ পথ হয়তো আত্মানুসন্ধানের, অথবা পার্থিব কোলাহল থেকে মুক্তির। এখন মেঘনার জল পেরিয়ে শীতকাল আসন্ন। বাতাসে বিষাদের ঘ্রাণ, কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ছে প্রকৃতি, যেন ফেরি পারাপারও থমকে গেছে এক অলস দুপুরে। দিনের আলো যেমন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় শীতের নির্জনতায়, ‘দৃ’ও যেন তেমনই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন এক আনন্দহীন ঋতুতে। বুকের গভীরে অ্যালান পোয়ের রচনাসমগ্রের মতো কোনো অমূল্য সম্পদ নিয়ে, তিনি হয়তো খুঁজে ফিরছেন স্বাধীনতার লুলাবাই কিংবা উডস্টকের মতো কাঙ্ক্ষিত সুখ। শহরের পর শহর পেরিয়ে, দৃশ্যমান হয়েও শ্রাব্যতার তরঙ্গ পেরিয়ে ‘দৃ’ চলে যাচ্ছেন, যেন তিনিও হয়ে উঠছেন এক ধ্রুপদ সঙ্গীত।
যদি বিড়ালেরা কবিতা লিখতো, তবে হয়তো তাদেরও ভিড় দেখা যেতো একাডেমির করিডোরে, পুরস্কার প্রত্যাশী কবিদের ভিড়ে। পরিষ্কার লিটার আর হুইস্কাস ক্যাটফুডের মোহে হয়তো তারাও ভুলে যেতো তাদের প্রকৃত সহজাত প্রবৃত্তি। হ্যাংওভারের মতো এক ঘোর নিয়ে শীতকাল চলে আসে, কিন্তু ঘুমিয়ে থাকা হয় না। বহু পরিচর্যার পোশাক যেমন হ্যাঙ্গারে ঝুলে থাকে অবহেলায়, তেমনি মানুষের মনও যেন নোংরা হয়ে ওঠে সময়ের সাথে। চটকদার চাকচিক্যে আবৃত করে রাখা হয় সেই হৃদয়কে, যেখানে লুকানো থাকে প্রেম, কাম, শরীর, যৌনতা আর মাথাব্যথার মতো অপ্রকাশিত সব বৃত্তান্ত। শীতের হিমেল পরশ যখন প্রকৃতিকে বিষণ্ণ করে তোলে, তখন যেন মানুষও নিজেদের বিশ্বাস থেকে দূরে সরে যায়, পৃথিবীর অসুখ নিয়ে এক অজানা গন্তব্যের পথে।
এই ডামাডোলের মাঝেও এক ভিন্ন সুরের আহ্বান, ‘মাধ্বী’ যেন গান হয়ে আসার আকুতি। কিছু সবুজ আর সতেজতা যেন জমে থাকুক গভীর শীতের মাঝেও। বৃষ্টির ধারা যেন ধুলো ঝেড়ে পরিষ্কার করে দেয় অচল যানের শহরকে। রক্তিম ভোরে শিউলি কুড়ানোর মতো এক নিরাভরণ সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, যেখানে আকাশের কোনো কৃত্রিম পলেস্তারা নেই। বাতাসে ভাসে ধানের ঘ্রাণ, দুপুরের আলোচ্ছটা আর উনুনের আঁচে জ্বাল করা মাছ-ক্লান্তি, আনাজপাতির সহজ জীবন। বিরহ শেষে প্রেমে সুখ খোঁজার মতো এক চিরন্তন সত্য যেন বারবার ফিরে আসে। ল্যাম্পপোস্টে এসে বসে ছোট্ট এক শালিক, চোখের ভেতর ইঁদুর সেজে রয়েছে এ কোন নাবিক? হাসপাতালে উৎকণ্ঠিত রোগীর মতো, মানুষের মনও যেন এক প্রকৃত গানের সুর শুনতে চায়। বাতাস বয়ে যায়, পাল তুলে চলে যায় মাঝবয়েসি নৌকা। রৌদ্র ঝিলমিল জল পান করে সূর্যের শব, সুধা। তেমনই নদীর কাছে, পল্লবিত ঝাউয়ের বনে প্রকৃত সুবাসে মিশে সেই গান যেন জীবনের মর্মবাণী হয়ে ওঠে।
তবে সুখের কাছাকাছি এসেও যেন এক দুরত্ব রয়ে যায়। শীতের ফুলকে পরাগায়ন যেমন খুন করে যায়, তেমনি মৌমাছির হুলও যেন গাছেদের মর্মরে এক আনন্দ প্রসারী ব্যথা গেঁথে যায়। এই আনন্দ-বিষাদের দোলাচলেই যেন নিহিত জীবনের প্রকৃত অর্থ, যা কোলাহল থেকে দূরে, নীরবতার উপবৃত্তাকার পথেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়।
রিপোর্টারের নাম 






















