ঢাকা ০৩:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নিরাপদ পানি মৌলিক অধিকার: রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা বাড়ালো হাইকোর্ট

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করেছে যে, নিরাপদ পানি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার, কোনো করুণা বা দয়া নয়। বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের এই রায় শুধু একটি আইনি দলিল নয়, এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য এক মুক্তির বার্তা।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই অধিকার স্বীকৃত হওয়ায়, রাষ্ট্র এখন আর ‘বাজেট নেই’ বা ‘প্রযুক্তি নেই’র মতো অজুহাত দেখিয়ে দায় এড়াতে পারবে না। বরং, সর্বোচ্চ সম্পদ ব্যবহার করে এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, পানি সরবরাহ এখন কেবল একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ নয়, এটি একটি ‘সাংবিধানিক আদেশ’। এই আদেশ অমান্য করা সংবিধানকে অবজ্ঞা করার শামিল। গ্রিক দার্শনিক থেলিসের উক্তি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের উদাহরণ টেনে আদালত পানির অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন, যা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নিরাপদ পানি নিশ্চিত না করা মানে নাগরিকদের বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া।

বিশ্বজুড়ে নিরাপদ পানিকে মানবাধিকার হিসেবে দেখার যে প্রবণতা, বাংলাদেশ এই রায়ের মাধ্যমে সেই পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পানি ও স্যানিটেশনকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, স্লোভেনিয়া, বলিভিয়া ও কোস্টারিকার মতো দেশগুলো তাদের সংবিধানে পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ মামলার রায়ও এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে সমর্থন করে। বাংলাদেশের হাইকোর্ট এই বৈশ্বিক আইনি ধারাকে আমাদের নিজস্ব বাস্তবতায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করেছেন।

এই রায় বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এক বড় স্বস্তি বয়ে আনবে, যেখানে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো এলাকায় লবণাক্ততা একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পানের ফলে নারীদের জরায়ু সংক্রান্ত রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভপাতের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত না করতে পারা মানে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অবজ্ঞা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল নলকূপ স্থাপন নয়, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, বৃহৎ আকারের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট এবং জলাধার সংরক্ষণের মতো উদ্ভাবনী সমাধানও নিশ্চিত করতে হবে।

হাইকোর্ট এই রায়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেস—যেমন রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, সরকারি হাসপাতাল এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে সবার জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ওয়াসাকে দ্রুততম সময়ে এই কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়াও, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি স্থানে এই পানি হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং আবাসিক ক্ষেত্রে এটি হবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে, যাতে অর্থের অভাবে কেউ তৃষ্ণার্ত না থাকে।

আদালত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, পানি যেন কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির মুনাফা অর্জনের মাধ্যম না হয়। পানির ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো অবশ্যই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশে পানি বেসরকারিকরণ করার ফলে সেবার মান কমেছে এবং খরচ বেড়েছে, বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটতে পারে না। একই সাথে, পানির উৎস রক্ষা করাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তুরাগ নদীর রায়ের উদাহরণ টেনে আদালত জলাভূমি রক্ষা, নদী দখল রোধ এবং শিল্পবর্জ্য দ্বারা নদী দূষণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা কোটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

সরকারকে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আদালতে অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। আশা করা যায়, সেই প্রতিবেদনে কেবল আমলাতান্ত্রিক ভাষা বা ‘প্রক্রিয়াধীন আছে’র মতো অজুহাত নয়, বরং বাস্তব কাজের প্রমাণ থাকবে। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপি দিয়ে মাপা যায় না, বরং তার মানুষের মৌলিক চাহিদা কতটুকু পূরণ হচ্ছে, তা দিয়ে মাপা হয়। হাইকোর্টের এই রায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পানির অভাব মানে কেবল পিপাসা নয়, পানির অভাব মানে জীবনের অপমান। এই ঐতিহাসিক রায় তখনই সার্থকতা পাবে, যেদিন দেশের প্রতিটি নাগরিক নির্বিঘ্নে এক গ্লাস নিরাপদ পানি পান করতে পারবে। আসুন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ি যেখানে পানি নিয়ে কোনো হাহাকার থাকবে না, যেখানে তৃষ্ণার্তের মুখে এক গ্লাস নিরাপদ পানি তুলে দেওয়া হবে রাষ্ট্রের পবিত্রতম কাজ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জামায়াত আমিরের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ: সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণে গুরুত্বারোপ

নিরাপদ পানি মৌলিক অধিকার: রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা বাড়ালো হাইকোর্ট

আপডেট সময় : ০৪:৩৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করেছে যে, নিরাপদ পানি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার, কোনো করুণা বা দয়া নয়। বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল এবং বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের এই রায় শুধু একটি আইনি দলিল নয়, এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য এক মুক্তির বার্তা।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই অধিকার স্বীকৃত হওয়ায়, রাষ্ট্র এখন আর ‘বাজেট নেই’ বা ‘প্রযুক্তি নেই’র মতো অজুহাত দেখিয়ে দায় এড়াতে পারবে না। বরং, সর্বোচ্চ সম্পদ ব্যবহার করে এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, পানি সরবরাহ এখন কেবল একটি ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ নয়, এটি একটি ‘সাংবিধানিক আদেশ’। এই আদেশ অমান্য করা সংবিধানকে অবজ্ঞা করার শামিল। গ্রিক দার্শনিক থেলিসের উক্তি এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের উদাহরণ টেনে আদালত পানির অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন, যা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নিরাপদ পানি নিশ্চিত না করা মানে নাগরিকদের বেঁচে থাকার পথ রুদ্ধ করে দেওয়া।

বিশ্বজুড়ে নিরাপদ পানিকে মানবাধিকার হিসেবে দেখার যে প্রবণতা, বাংলাদেশ এই রায়ের মাধ্যমে সেই পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পানি ও স্যানিটেশনকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, স্লোভেনিয়া, বলিভিয়া ও কোস্টারিকার মতো দেশগুলো তাদের সংবিধানে পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ‘নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন’ মামলার রায়ও এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটকে সমর্থন করে। বাংলাদেশের হাইকোর্ট এই বৈশ্বিক আইনি ধারাকে আমাদের নিজস্ব বাস্তবতায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করেছেন।

এই রায় বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এক বড় স্বস্তি বয়ে আনবে, যেখানে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের মতো এলাকায় লবণাক্ততা একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পানের ফলে নারীদের জরায়ু সংক্রান্ত রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং গর্ভপাতের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত না করতে পারা মানে নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অবজ্ঞা করা। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল নলকূপ স্থাপন নয়, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং, বৃহৎ আকারের ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট এবং জলাধার সংরক্ষণের মতো উদ্ভাবনী সমাধানও নিশ্চিত করতে হবে।

হাইকোর্ট এই রায়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক প্লেস—যেমন রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, সরকারি হাসপাতাল এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে সবার জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে হবে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং ওয়াসাকে দ্রুততম সময়ে এই কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়াও, আগামী ১০ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ঘরে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি স্থানে এই পানি হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং আবাসিক ক্ষেত্রে এটি হবে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে, যাতে অর্থের অভাবে কেউ তৃষ্ণার্ত না থাকে।

আদালত কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, পানি যেন কোনো বাণিজ্যিক কোম্পানির মুনাফা অর্জনের মাধ্যম না হয়। পানির ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো অবশ্যই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশে পানি বেসরকারিকরণ করার ফলে সেবার মান কমেছে এবং খরচ বেড়েছে, বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটতে পারে না। একই সাথে, পানির উৎস রক্ষা করাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তুরাগ নদীর রায়ের উদাহরণ টেনে আদালত জলাভূমি রক্ষা, নদী দখল রোধ এবং শিল্পবর্জ্য দ্বারা নদী দূষণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন, যা কোটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

সরকারকে ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আদালতে অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। আশা করা যায়, সেই প্রতিবেদনে কেবল আমলাতান্ত্রিক ভাষা বা ‘প্রক্রিয়াধীন আছে’র মতো অজুহাত নয়, বরং বাস্তব কাজের প্রমাণ থাকবে। একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন কেবল জিডিপি দিয়ে মাপা যায় না, বরং তার মানুষের মৌলিক চাহিদা কতটুকু পূরণ হচ্ছে, তা দিয়ে মাপা হয়। হাইকোর্টের এই রায় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পানির অভাব মানে কেবল পিপাসা নয়, পানির অভাব মানে জীবনের অপমান। এই ঐতিহাসিক রায় তখনই সার্থকতা পাবে, যেদিন দেশের প্রতিটি নাগরিক নির্বিঘ্নে এক গ্লাস নিরাপদ পানি পান করতে পারবে। আসুন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ি যেখানে পানি নিয়ে কোনো হাহাকার থাকবে না, যেখানে তৃষ্ণার্তের মুখে এক গ্লাস নিরাপদ পানি তুলে দেওয়া হবে রাষ্ট্রের পবিত্রতম কাজ।