দেশের অর্থনীতি এখন এক গভীর সংকটের মুখে, যা আগামী দিনের জন্য অশনি সংকেত বহন করছে। আসন্ন নির্বাচনের বছরে ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ, রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া, ভঙ্গুর ব্যাংক খাত এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল স্থানীয় বাজারে না পৌঁছানোর মতো বিষয়গুলো অর্থনীতিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নীতি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এসব প্রবণতাকে স্বল্পমেয়াদি সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে, যা দেশকে ‘ঋণফাঁদ’ বা ‘নিম্ন-মধ্যম আয়ের ফাঁদে’ ফেলে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকায় নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি তাদের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন তুলে ধরে। সংস্থাটি জানায়, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক মন্দা যখন বিনিয়োগ ও জনআস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, ঠিক তখনই বাজেট ও বাজার সংশ্লিষ্ট সূচকগুলো নীতি প্রণয়নের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
শিক্ষা নয়, এখন ঋণের বোঝা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ
জাতীয় বাজেটের অগ্রাধিকার তালিকায় এক বিশাল পরিবর্তন এখন স্পষ্ট। সিপিডি’র তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় বর্তমানে বাজেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাতে পরিণত হয়েছে। এটি দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত শিক্ষা খাতকেও ছাড়িয়ে গেছে। সিপিডি’র বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “এটি কেবল একটি আর্থিক সমন্বয় নয়, বরং ক্রমবর্ধমান ঋণের দায় মেটাতে গিয়ে জাতীয় অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন এসেছে, তারই প্রতিফলন।” তিনি আরও সতর্ক করেন, অনেক দেশ নিম্ন আয় থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের স্তরে উত্তরণের সময় এই পর্যায়ে এসে হোঁচট খায়, যখন ঋণ পরিশোধের চাপ উন্নয়নমুখী ব্যয়কে সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশও এমন ঝুঁকির বাইরে নয়।
আদায় বাড়লেও কমছে না রাজস্ব ঘাটতি
নামমাত্র হিসাবে রাজস্ব আদায় বাড়লেও তা ধারাবাহিকভাবেই লক্ষ্যমাত্রার নিচে রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি। তবে এই সময়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতি রয়ে গেছে। এই ঘাটতি সত্ত্বেও সরকার চলতি বছরের জন্য সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়েছে, যা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন মন্থর, তখন এই বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় রয়েছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, “কর প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া কেবল লক্ষ্যমাত্রা বাড়ালে রাজস্ব বৃদ্ধির বদলে কর ফাঁকি বাড়ার আশঙ্কা থাকে।”
অর্থনীতির ভঙ্গুর দশায় ব্যাংক খাতের চরম অস্থিরতা
দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর দশায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো ব্যাংক খাত। সিপিডি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতার কারণে এই খাতটি এখন গোটা অর্থনীতির জন্য একটি স্থায়ী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড. ফাহমিদা খাতুন জোর দিয়ে বলেন, “ব্যাংক খাতের সংস্কার ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।” তিনি শক্তিশালী আইন, কার্যকর ঋণ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও বেশি স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, নির্বাচন শেষে সংস্কারের গতি শ্লথ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যা আমানতকারীদের আস্থা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।
বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরলেও দেশের বাজারে দাম চড়া
ভোক্তা পর্যায়ে বৈশ্বিক ও দেশীয় দামের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধানের বিষয়টিও তুলে ধরেছে সিপিডি। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমলেও দেশের বাজারে তা এখনও চড়া। অথচ বাংলাদেশ বছরে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন করে, তা অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়েও বেশি। চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারেও একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। সিপিডি’র মতে, “এটি দুর্বল প্রতিযোগিতা ও বাজার সিন্ডিকেটের প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়, যা মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
মূল্যস্ফীতি কমার কোনো লক্ষণ নেই
ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে নামলেও সিপিডি’র মতে, মূল্যস্ফীতি এখনও অর্থনীতির কাঠামোতে গভীরভাবে গেঁথে আছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে দামের এই ঊর্ধ্বগতি কেবল খাদ্য সরবরাহ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই শুধুমাত্র সুদের হার বাড়িয়ে এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সিপিডি’র মতে, বাজার তদারকি জোরদার করা, সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার এবং সিন্ডিকেট বা যোগসাজশের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বিনিয়োগ ও দক্ষতাই সামনে এগোনোর পথ
এসব ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সিপিডি মনে করে, সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার সুযোগ এখনও রয়েছে। সংস্থাটি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি বহুমুখী করা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনশক্তি। সঠিক নীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে এই জনসংখ্যাগত সুবিধাই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে।” তবে সিপিডি সতর্ক করে বলেছে, সময়মতো সংস্কার করা না হলে অর্থনীতির গভীরে জমে থাকা এই চাপগুলো দীর্ঘমেয়াদী বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন দেশ একটি নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে প্রবেশ করছে।
রিপোর্টারের নাম 
























