ঢাকা ০৮:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

‘বেহেশত’ বিতর্ক: ভোলায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে রণক্ষেত্র রায়চাঁদবাজার, আহত অন্তত ৩০

ভোলায় রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’—এমন একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে লালমোহন উপজেলার রায়চাঁদবাজারে রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯-১০ জনকে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভোলা জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এই ঘটনা ঘটে। ‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’—এই মন্তব্যের সূত্র ধরে প্রথমে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে এটি ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রায়চাঁদবাজার সংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়কে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন উভয় পক্ষের লোকজন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় সংঘর্ষে অংশ নেওয়া একপক্ষ নৌবাহিনীর গাড়িতে হামলার চেষ্টাও করে বলে জানা গেছে।

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে গতকাল রাত ৯টার দিকে লালমোহন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জামায়াত-সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও বাংলাদেশ উন্নয়ন পার্টির (বিডিপি) মহাসচিব নিজামুল হক। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে জামায়াতের এক নারী কর্মী বৈঠক শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিএনপি কর্মী রুবেল তাকে লাঞ্ছিত করেন এবং অশালীন ভাষায় গালাগালি করেন। ওই নারীর স্বামী ও জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিন রুবেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গেলে তাকেও গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। বিকেলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবাল সমঝোতার চেষ্টা করলেও পরে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়। নিজামুল হক অভিযোগ করেন, তিনি ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী নিয়ে জামায়াত কার্যালয়ে যাওয়ার পথে দুই শতাধিক বিএনপি কর্মী তাদের ওপর হামলা চালালে সংঘর্ষ শুরু হয়। তার দাবি, সংঘর্ষে জামায়াতের আমির আবদুল হক, সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল আমিনসহ দলের স্থানীয় নেতাসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জাফর ইকবাল জামায়াতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াত নেতারা ‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’—এমন অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন, যা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেন। তবে তার দাবি, পরে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জসিম উদ্দিন ও স্থানীয় মুরব্বি নান্নু মাস্টারসহ বিএনপির ১৫-১৬ জন নেতাকর্মী আহত হন। জাফর ইকবাল জানান, তার নেতৃত্বে কোনো হামলা হয়নি এবং জামায়াতের অভিযোগ মিথ্যা। এ বিষয়ে তারা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করবেন।

লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলিউল ইসলাম সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জামায়াতের নারী কর্মীদের দাওয়াতি কাজ নিয়ে সকালে বাগবিতণ্ডা হলেও পরে রাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। ওসি বলেন, ‘আমরা শুনেছি, জামায়াতে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে—এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা, তবে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।’ তিনি আরও জানান, এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপি ও জামায়াত রায়চাঁদবাজারে লোক জমায়েত করে। বাজারের ভেতর রাস্তা সংস্কারের জন্য রাখা ইট উভয় পক্ষ একে অপরের দিকে নিক্ষেপ করে। আহত ৯ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভোলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি এবং কোনো লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি, তবে অভিযোগ আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আফগান রাজধানীতে পাকিস্তানের বিমান হামলার অভিযোগ, সীমান্তে চরম উত্তেজনা

‘বেহেশত’ বিতর্ক: ভোলায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে রণক্ষেত্র রায়চাঁদবাজার, আহত অন্তত ৩০

আপডেট সময় : ০৩:৫১:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

ভোলায় রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’—এমন একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে লালমোহন উপজেলার রায়চাঁদবাজারে রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯-১০ জনকে লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভোলা জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাকিদের স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এই ঘটনা ঘটে। ‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’—এই মন্তব্যের সূত্র ধরে প্রথমে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে এটি ভয়াবহ সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে রায়চাঁদবাজার সংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়কে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেন উভয় পক্ষের লোকজন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নৌবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় সংঘর্ষে অংশ নেওয়া একপক্ষ নৌবাহিনীর গাড়িতে হামলার চেষ্টাও করে বলে জানা গেছে।

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে গতকাল রাত ৯টার দিকে লালমোহন উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জামায়াত-সমর্থিত সংসদ সদস্য প্রার্থী ও বাংলাদেশ উন্নয়ন পার্টির (বিডিপি) মহাসচিব নিজামুল হক। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে জামায়াতের এক নারী কর্মী বৈঠক শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিএনপি কর্মী রুবেল তাকে লাঞ্ছিত করেন এবং অশালীন ভাষায় গালাগালি করেন। ওই নারীর স্বামী ও জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিন রুবেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গেলে তাকেও গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। বিকেলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবাল সমঝোতার চেষ্টা করলেও পরে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়। নিজামুল হক অভিযোগ করেন, তিনি ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী নিয়ে জামায়াত কার্যালয়ে যাওয়ার পথে দুই শতাধিক বিএনপি কর্মী তাদের ওপর হামলা চালালে সংঘর্ষ শুরু হয়। তার দাবি, সংঘর্ষে জামায়াতের আমির আবদুল হক, সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল আমিনসহ দলের স্থানীয় নেতাসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

অন্যদিকে, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. জাফর ইকবাল জামায়াতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াত নেতারা ‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’—এমন অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন, যা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা করেন। তবে তার দাবি, পরে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জসিম উদ্দিন ও স্থানীয় মুরব্বি নান্নু মাস্টারসহ বিএনপির ১৫-১৬ জন নেতাকর্মী আহত হন। জাফর ইকবাল জানান, তার নেতৃত্বে কোনো হামলা হয়নি এবং জামায়াতের অভিযোগ মিথ্যা। এ বিষয়ে তারা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করবেন।

লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অলিউল ইসলাম সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জামায়াতের নারী কর্মীদের দাওয়াতি কাজ নিয়ে সকালে বাগবিতণ্ডা হলেও পরে রাতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। ওসি বলেন, ‘আমরা শুনেছি, জামায়াতে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে—এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা, তবে এর সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।’ তিনি আরও জানান, এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপি ও জামায়াত রায়চাঁদবাজারে লোক জমায়েত করে। বাজারের ভেতর রাস্তা সংস্কারের জন্য রাখা ইট উভয় পক্ষ একে অপরের দিকে নিক্ষেপ করে। আহত ৯ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ভোলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত কেউ আটক হয়নি এবং কোনো লিখিত অভিযোগও পাওয়া যায়নি, তবে অভিযোগ আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।