ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র বিক্ষোভের মুখে গভীর বৈধতা সংকটে পড়েছে। চলমান এই জনবিক্ষোভ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাংক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাটাঙ্কা পরিস্থিতিকে কেবল অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ। তাঁর মতে, এটি শুধু ইরানি মুদ্রার (রিয়াল) পতন নয়, বরং জনগণের আস্থারও চরম ধ্বস। রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হয়ে গত মাসে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ এখন দেশটির ৩১টি প্রদেশের সবকটিতেই বিস্তার লাভ করেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ একদিকে আলোচনার আশ্বাস দিচ্ছে, অন্যদিকে কঠোর দমন-পীড়নও চালাচ্ছে। কোথাও কোথাও সহিংস সংঘর্ষে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছে, আবার একই সঙ্গে সরকার অর্থনৈতিক অসন্তোষের বিষয়টি স্বীকারও করে নিয়েছে।
লোরেস্তান প্রদেশের ২৫ বছর বয়সী বেকার স্নাতক মিনা তাঁর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আমি শুধু শান্ত, স্বাভাবিক একটা জীবন চাই। অথচ তারা (সরকার) পারমাণবিক কর্মসূচি, বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার দিকেই জোর দিচ্ছে।” বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় পতাকা নামিয়ে ফেলছে, তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রাদেশিক শহরে মিছিল করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মসজিদ থেকে বেরিয়ে তরুণরা বিক্ষোভে যোগ দিচ্ছে, যা ধর্মীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবাধ্যতার ইঙ্গিত বহন করে। ইসলামি বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর শাসকগোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগ হারানো। বিপ্লবী স্লোগান ও বাধ্যতামূলক পোশাকবিধি প্রত্যাখ্যান করছে তারা। একসময় রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হিজাব এখন প্রকাশ্যে অমান্য করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনও তেহরানের অবস্থানকে দুর্বল করেছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইসরায়েলি হামলা এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মতো মিত্র হারানো এই প্রভাব কমিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও বিভক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য হামলার হুমকি দিয়েছেন, অন্যদিকে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ইরান কোনো শত্রুর কাছেই মাথা নত করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে দমন-পীড়ন ও সীমিত ছাড়ের মাধ্যমে সরকার বিক্ষোভ সামাল দিতে পারলেও এবার সেই কৌশল কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। প্রবাসী বিরোধী গোষ্ঠীগুলো আরও আন্দোলনের ডাক দিলেও ইরানের ভেতরে তাদের প্রকৃত সমর্থন কতটা, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে চলমান পরিস্থিতি যে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
রিপোর্টারের নাম 
























