ঢাকা ১২:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে: স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে গভীর শঙ্কা

দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদী মন্দা দেখা দিয়েছে। টানা ছয় মাস ধরে এই খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে আটকে থাকায় বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.৫৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম। অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা বলছেন, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে সৃষ্ট ‘মব কালচার’ ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থানের ওপর।

বেসরকারি খাতে ঋণের এই মন্থর গতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া থেকে বিরত থাকায় ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বরে যেখানে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকায়। প্রবৃদ্ধির এই হার (৬.৫৮%) গত অক্টোবর মাসের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬.২৩ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও তা বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নের কোনো বার্তা দিচ্ছে না। সিডিপি-র অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে যে দেশে নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণ একেবারেই থমকে আছে। এর ফলে বেকারত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম প্রধান প্রমাণ হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি (Capital Machinery) আমদানির দায় নিষ্পত্তি কমে যাওয়া। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে এই দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থাৎ, ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। এর পেছনে ডলার সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তাকে দায়ী করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ‘মব কালচার’ বা অরাজক পরিস্থিতি বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিনিয়োগ আসবে না।” এছাড়া তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা কারখানা পুরোদমে চালাতে পারছেন না। হাতেম আরও জানান, গ্যাস সংকটের আশঙ্কায় তিনি নিজেই কারখানা সম্প্রসারণ করতে পারেননি। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে মুনাফা করা তো দূরে থাক, লোকসান ঠেকানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বেশ কিছু বড় শিল্পগোষ্ঠী যেমন নাসা, বেক্সিমকো ও গাজী গ্রুপের অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে যে কারখানাগুলো সচল আছে, সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও আগের তুলনায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী মনে করেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল হলে ব্যবসায়ীরা আবার সক্রিয় হতে পারেন।

বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো এখন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। শতভাগ নিরাপদ এবং প্রায় ১১ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা থাকায় অনেক প্রচলিত ব্যাংক এখন সাধারণ ঋণের চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে টাকা রাখাকেই শ্রেয় মনে করছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ এখন সরকারি খাত থেকে আসছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন: মাটির নিচে অত্যাধুনিক বাংকার ও টানেল নির্মাণের পরিকল্পনা

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে: স্থবির বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নিয়ে গভীর শঙ্কা

আপডেট সময় : ০১:০৪:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদী মন্দা দেখা দিয়েছে। টানা ছয় মাস ধরে এই খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে আটকে থাকায় বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.৫৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম। অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা বলছেন, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে সৃষ্ট ‘মব কালচার’ ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন ও নতুন কর্মসংস্থানের ওপর।

বেসরকারি খাতে ঋণের এই মন্থর গতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া থেকে বিরত থাকায় ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদা নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বরে যেখানে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, ২০২৫ সালের নভেম্বরে তা সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকায়। প্রবৃদ্ধির এই হার (৬.৫৮%) গত অক্টোবর মাসের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬.২৩ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি হলেও তা বিনিয়োগ পরিস্থিতি উন্নয়নের কোনো বার্তা দিচ্ছে না। সিডিপি-র অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে যে দেশে নতুন শিল্প স্থাপন বা সম্প্রসারণ একেবারেই থমকে আছে। এর ফলে বেকারত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিনিয়োগ স্থবিরতার অন্যতম প্রধান প্রমাণ হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি (Capital Machinery) আমদানির দায় নিষ্পত্তি কমে যাওয়া। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে এই দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থাৎ, ব্যবসায়ীরা নতুন কারখানা করার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। এর পেছনে ডলার সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তাকে দায়ী করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ‘মব কালচার’ বা অরাজক পরিস্থিতি বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বিনিয়োগ আসবে না।” এছাড়া তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা কারখানা পুরোদমে চালাতে পারছেন না। হাতেম আরও জানান, গ্যাস সংকটের আশঙ্কায় তিনি নিজেই কারখানা সম্প্রসারণ করতে পারেননি। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষে মুনাফা করা তো দূরে থাক, লোকসান ঠেকানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বেশ কিছু বড় শিল্পগোষ্ঠী যেমন নাসা, বেক্সিমকো ও গাজী গ্রুপের অনেক কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে যে কারখানাগুলো সচল আছে, সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও আগের তুলনায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। পূবালী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ আলী মনে করেন, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল হলে ব্যবসায়ীরা আবার সক্রিয় হতে পারেন।

বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো এখন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। শতভাগ নিরাপদ এবং প্রায় ১১ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা থাকায় অনেক প্রচলিত ব্যাংক এখন সাধারণ ঋণের চেয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে টাকা রাখাকেই শ্রেয় মনে করছে। ফলে ব্যাংকগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ এখন সরকারি খাত থেকে আসছে।