কথায় আছে- নতুন বছর মানেই নতুন আলোর বিকিরণ। এক সূর্য অস্ত গিয়ে নতুন এক সূর্যের উদয়। সেই সঙ্গে প্রত্যাশায় থাকে নতুন কিছু, আশার আলো জ্বালাবে এক রাঙা প্রভাত। তেমনই আশা নতুন বছর ঘিরে। বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। গণতন্ত্রের এক নতুন উত্তরণ ঘটবে। ২০২৬ আসবে পরিবর্তিত এক নতুন আলোকবর্তিকা নিয়ে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গত ১৬ মাস ধরে চলা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা কমে একটা স্থিতিশীল বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা সময় জুড়েই আলোচনায় ছিল মব, রাজনৈতিক সহিংসতা, মানবাধিকার, অর্থনীতিসহ নানা ইস্যু। সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতিক স্থিতিশীলতা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই চ্যালেঞ্জ থাকবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করা সরকারেরও।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জের মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্দশা এখনও রয়ে গেছে। অর্থনীতিতে এখনও কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়নি। প্রবৃদ্ধি মন্থর, বিনিয়োগে খরা, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা, রফতানিতে ভাটা এখনও। নেই উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক ঋণ এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ।
সামাজিক অস্থিরতার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল মব সহিংসতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের বছর মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হন অন্তত ১২৮ জন। ২০২৫ সালে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসময় দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে হত্যার শিকার হয়েছেন তিনজন সাংবাদিক এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রহস্যজনকভাবে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন।
এছাড়া ডেইলি স্টার, প্রথম আলো এবং উদীচী ও ছায়ানটে হামলা, ভাঙচুর এবং আগুন লাগানোর মতো ঘটনা ঘটেছে। এগুলো নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। তবে তারা প্রত্যাশা করছেন, দ্রুতই এগুলো থেকে মুক্তি পাবে বাংলাদেশ।
মানবাধিকার কর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রথমত, রাজনৈতিক সহিংসতা যেন কোনও মাত্রায় না হয়। নির্বাচন পরবর্তী ও পূর্ববর্তী এবং একইসঙ্গে নির্বাচনের রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রাটা যেন কম হয়। কেননা, ইতোমধ্যে প্রায় কয়েক হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে। গত দেড় বছরে দুই শতাধিক নিহত হয়েছেন রাজনৈতিক সহিংসতায়। সুতরাং, এই রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, যে ধরনের সংগঠন বা মানবাধিকার রক্ষার কাজে বাধা প্রদান করছে, যেমন- র্যাব এবং একইসঙ্গে গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা যেন আগামীতে রাজনৈতিক খেলায় তারা অংশগ্রহণ না করতে পারে, সেই দিকটা নিশ্চিত করা জরুরি।”
তিনি বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্বের বাইরে কোনও ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রক্রিয়া যেন যুক্ত না হয়, সেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তৃতীয়ত, যে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে কাজ করা ছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে নাগরিকদের মানবাধিকারসংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ববান হওয়া। তাদের সেই প্রেক্ষাপটটা মাথায় রেখে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা যেন রক্ষা করার কাজটা করা যেতে পারে। এই তিনটি কাজ করা খুব জরুরি।”
২০২৫ সালকে অনেকেই অবিহিত করেন আন্দোলন করে দাবি দাওয়া আদায়ের বছর হিসেবে। নানা দাবিতে রাজপথ অবরোধ, ঘেরাও ছিল প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। এজন্য স্থিতিশীল একটি পরিবেশের প্রত্যাশা করা হচ্ছে নতুন বছরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, “দেশের মানুষ একটি নির্বাচিত সরকার চায়, নির্বাচিত সরকার এই অর্থে যে; এমন একটি সরকার যারা সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে, যাদের সমালোচনা করা যাবে এবং যাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধ করা যাবে। এই ধরনের একটি সরকার সারাদেশের দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা। আকাঙ্ক্ষার মূল বিষয় হলো- মনে স্বস্তি এবং কনফিডেন্স ফিরিয়ে আনা।”
তিনি বলেন, “অর্থনীতির দিক থেকে বলতে গেলে, আমাদের অর্থনীতিতে যে বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়েছে, ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রেও আমরা আগ্রহী কাউকে পাচ্ছি না এবং দেশীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পাচ্ছি না। একই সঙ্গে আমাদের আইএমএফ থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠানই আমাদের বলছে যে, তারা আমাদের আর ঋণ দিবে না। ফলে অন্যরা আমাদের ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে না। এই বার্তাগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আপনার সঙ্গে যারা ব্যবসা করছে বহির্বিশ্বে, তাদেরও কিন্তু আস্তে আস্তে আপনার ওপর কনফিডেন্স লোপ পেতে থাকে। যেটা আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটা বড় প্রভাব রাখে।”
তিনি আরও বলেন, “আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের কনফিডেন্স অনেকটাই কমে গেছে। আপনি যদি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থনীতির মূল ধারায় সম্পৃক্ত করতে না পারেন—যেটা আমাদের মতো অল্পশিক্ষিত দেশের ক্ষেত্রে বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি নতুন করে এমন এক বার্তা দেয়, যা মোটেই আমাদের জন্য পজিটিভ নয়।
অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের সামাজিক জীবনেও আমরা বড় ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করছি। অস্থিরতা বলতে আমরা দেখেছি বিভিন্ন কনসার্টে হামলা, উদীচীতে হামলা, ছায়ানটে হামলা। সব মত, সব দল ও সব ধর্মকে সহনশীলতার সঙ্গে নিয়ে চলার হাজার বছরের যে ইতিহাস আমাদের রয়েছে, সেটাই আমাদের পরিচয়। আবহমান বাংলার সেই হোমোজেনিটি ও সংস্কৃতির জায়গায় এবার আমরা খুব তীব্রভাবে ভিন্নতা লক্ষ্য করছি। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির প্রয়োজন রয়েছে, কারণ এসব বিষয় আমাদের বাঙালি ও বাংলাদেশি সংস্কৃতির চিন্তা, ধারণা, দর্শন ও চেতনার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের প্রথম আশা হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণ। কারণ, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের সঙ্গে স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিনির্মাণ—সবকিছুরই সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।”
তিনি বলেন, “জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা যে উদার, নৈতিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিলাম—যে বাংলাদেশ উন্নত মানসিকতা ও উন্নয়নের দিকে ধাবিত হবে; তা না দেখে আমরা বরং একটি পশ্চাৎপদ ও রক্ষণশীল বাংলাদেশের আলামত দেখতে পাচ্ছি। আমরা এমন কিছু শক্তির উত্থান লক্ষ্য করছি, যারা নানান নামে সামনে এসেছে। এই গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং তারা অস্থিতিশীলতা তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে।”
তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি দেশই অপেক্ষা করছে—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ কবে হবে। সেখানে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকাল এবং নির্বাচন না হওয়া কিংবা নির্বাচিত সরকার না থাকার কারণেই আমাদের এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।”
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “এই অবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো নির্বাচন। নববর্ষে আমাদের সবার শপথ হওয়া উচিত—যে ফ্যাসিবাদ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের আঁকড়ে ছিল এবং তথাকথিত যে নির্বাচন আমরা দেখেছি, তার বাইরে গিয়ে দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। তাহলেই সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে; একইসঙ্গে বৈদেশিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।”
রিপোর্টারের নাম 























