ঢাকা ০১:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: নিহত পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, আহত শিশুদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ সুপারিশ

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান দুর্ঘটনার মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন। একইসঙ্গে, গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্নিদগ্ধ আহতদের জন্য ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্যাকেজ সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রণীত ক্ষতিপূরণ মডেল অনুসরণ করে তদন্ত কমিশন এসব সুপারিশ করেছে।

নিহতদের পরিবারকে প্রদেয় ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের অর্ধেক অর্থ এককালীন নগদ হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি অর্ধেক অর্থ পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র আকারে সরবরাহ করবে সরকার।

**আহতদের জন্য পুনর্বাসন প্যাকেজ ও অর্থ প্রদানের কাঠামো**

আহতদের আঘাতের মাত্রা এবং ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কমিশন তিনটি স্তরে চিকিৎসা পুনর্বাসন প্যাকেজ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে:

১. **গুরুতর আহত (দীর্ঘমেয়াদি):** যারা ১৫ বছর পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে হবে বা দীর্ঘমেয়াদি অগ্নিদগ্ধ, তাদের জন্য মোট ১৫ লাখ টাকার চিকিৎসা পুনর্বাসন প্যাকেজ সুপারিশ করা হয়েছে।
২. **মধ্যম মাত্রার আহত:** যাদের ১০ বছর চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের জন্য ৯ লাখ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে।
৩. **স্বল্পমেয়াদি আহত:** যাদের পাঁচ বছর চিকিৎসা নিতে হবে, তাদের জন্য এক লাখ টাকা চিকিৎসা পুনর্বাসন প্যাকেজের সুপারিশ করা হয়েছে।

আহতদের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে সম্ভাব্য দৈহিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি এবং প্রতিকূলতা বিবেচনা করেছে কমিশন।

**কিস্তি ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থ প্রদান**

আহতদের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানে বিশেষ কাঠামো অনুসরণ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা বয়সভেদে ভিন্ন।

**আহত শিশুদের ক্ষেত্রে:** আহত শিশুদের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের ৫০ শতাংশ সমান দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রথম কিস্তি পাওয়ার এক বছর পর দ্বিতীয় কিস্তি দেওয়া হবে। বাকি ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে, যা শিশুর বয়স ২৫ বছর না হওয়া পর্যন্ত উত্তোলন করা যাবে না।

**প্রাপ্তবয়স্ক আহতদের ক্ষেত্রে:** প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের ৫০ শতাংশ সমান দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে। প্রথম কিস্তির এক বছর পর দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ প্রদান করা হবে। বাকি ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে, যা পাঁচ বছরের আগে উত্তোলন করা যাবে না।

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল এবং জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে এসব ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের অর্থ দেওয়া হবে।

**পাইলটের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ নয়**

তবে বিধ্বস্ত বিমানের তরুণ পাইলটের পরিবারের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ সুপারিশ করেনি কমিশন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাদের নিজস্ব বিধিমালা অনুযায়ী পাইলটের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবে।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারকেও সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে বহু শিশু শিক্ষার্থী নিহত ও আহত হওয়ায় একইভাবে তাদের জন্যও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে তদন্ত কমিশন এসব সুপারিশ করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় অগ্নিদগ্ধদের জন্য পৃথক একটি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্যাকেজ নিয়েও সিদ্ধান্ত হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৩৫ জন নিহত এবং প্রায় ১৭২ জন আহত হন। নিহত ও আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ১৮ বছরের নিচের শিশু শিক্ষার্থী, যাদের অধিকাংশই অগ্নিদগ্ধ হয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপালকে ‘বাংলাদেশ’ হতে দেব না: কাঠমাণ্ডুতে সুশীলা কারকির কড়া হুঁশিয়ারি

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: নিহত পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ, আহত শিশুদের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ সুপারিশ

আপডেট সময় : ০৩:১৭:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান দুর্ঘটনার মর্মান্তিক ঘটনায় নিহত পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন। একইসঙ্গে, গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্নিদগ্ধ আহতদের জন্য ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্যাকেজ সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রণীত ক্ষতিপূরণ মডেল অনুসরণ করে তদন্ত কমিশন এসব সুপারিশ করেছে।

নিহতদের পরিবারকে প্রদেয় ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের অর্ধেক অর্থ এককালীন নগদ হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি অর্ধেক অর্থ পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র আকারে সরবরাহ করবে সরকার।

**আহতদের জন্য পুনর্বাসন প্যাকেজ ও অর্থ প্রদানের কাঠামো**

আহতদের আঘাতের মাত্রা এবং ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে কমিশন তিনটি স্তরে চিকিৎসা পুনর্বাসন প্যাকেজ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে:

১. **গুরুতর আহত (দীর্ঘমেয়াদি):** যারা ১৫ বছর পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে হবে বা দীর্ঘমেয়াদি অগ্নিদগ্ধ, তাদের জন্য মোট ১৫ লাখ টাকার চিকিৎসা পুনর্বাসন প্যাকেজ সুপারিশ করা হয়েছে।
২. **মধ্যম মাত্রার আহত:** যাদের ১০ বছর চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের জন্য ৯ লাখ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে।
৩. **স্বল্পমেয়াদি আহত:** যাদের পাঁচ বছর চিকিৎসা নিতে হবে, তাদের জন্য এক লাখ টাকা চিকিৎসা পুনর্বাসন প্যাকেজের সুপারিশ করা হয়েছে।

আহতদের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে সম্ভাব্য দৈহিক, মানসিক, আর্থিক ও সামাজিক ক্ষতি এবং প্রতিকূলতা বিবেচনা করেছে কমিশন।

**কিস্তি ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে অর্থ প্রদান**

আহতদের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানে বিশেষ কাঠামো অনুসরণ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যা বয়সভেদে ভিন্ন।

**আহত শিশুদের ক্ষেত্রে:** আহত শিশুদের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের ৫০ শতাংশ সমান দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রথম কিস্তি পাওয়ার এক বছর পর দ্বিতীয় কিস্তি দেওয়া হবে। বাকি ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে, যা শিশুর বয়স ২৫ বছর না হওয়া পর্যন্ত উত্তোলন করা যাবে না।

**প্রাপ্তবয়স্ক আহতদের ক্ষেত্রে:** প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের ৫০ শতাংশ সমান দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে। প্রথম কিস্তির এক বছর পর দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ প্রদান করা হবে। বাকি ৫০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে, যা পাঁচ বছরের আগে উত্তোলন করা যাবে না।

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল এবং জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তহবিল থেকে এসব ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের অর্থ দেওয়া হবে।

**পাইলটের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ নয়**

তবে বিধ্বস্ত বিমানের তরুণ পাইলটের পরিবারের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ সুপারিশ করেনি কমিশন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাদের নিজস্ব বিধিমালা অনুযায়ী পাইলটের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেবে।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, জুলাই আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারকেও সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে বহু শিশু শিক্ষার্থী নিহত ও আহত হওয়ায় একইভাবে তাদের জন্যও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে তদন্ত কমিশন এসব সুপারিশ করেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় অগ্নিদগ্ধদের জন্য পৃথক একটি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্যাকেজ নিয়েও সিদ্ধান্ত হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় প্রায় ৩৫ জন নিহত এবং প্রায় ১৭২ জন আহত হন। নিহত ও আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই ১৮ বছরের নিচের শিশু শিক্ষার্থী, যাদের অধিকাংশই অগ্নিদগ্ধ হয়।